‘ঝলকে ওঠা স্বপ্নডাঙা’: ট্যাং কবিতার অপ্রতিরোধ্যতার অন্বেষা

 ‘ঝলকে ওঠা স্বপ্নডাঙা’: ট্যাং কবিতার অপ্রতিরোধ্যতার অন্বেষা
– মোস্তফা তোফায়েল হোসেন
গৌরাঙ্গ মোহান্তের অনুবাদ গ্রন্থ ‘ঝলকে ওঠা স্বপ্নডাঙা’ ট্যাং যুগের (৬১৮-৯০৭ খ্রিস্টাব্দ) একগুচ্ছ চীনা কবিতার বাংলা অনুবাদ। কবিতার সোনালি যুগ ছিল ট্যাং রাজবংশকাল; এ যুগে বাইশ হাজার কবি উপহার দেন প্রায় পঞ্চাশ হাজার কবিতা। সংখ্যাগত পরিসংখ্যানকে ছাপিয়ে গেছে অনুবাদকের অপর বিবেচনা; সেটি কবিতার গুণগত দিক। এর পরশপাথর তুল্য ভূমিকা ও সমাজ-মানস গঠনে অপ্রতিরোধ্য কার্যকারিতা আজকের দিনেও  হয়ে উঠতে পারে একটি ঝলকে ওঠা তারার মতো দিক-নির্ণায়ক উপকরণ। কবিতা সময় কাটানোর জন্য “আলস্যের সহস্র সঞ্চয়” নয়; কবিতা আত্মোন্নয়নের সূত্র, বলেছেন অনুবাদক। আমাদের সমাজের ডাঙা বা শুষ্ক ভূমিতে কবিতা সঞ্চার করতে পারে নীতিবোধ, মূল্যবোধ, পরিমিতিবোধ, পিতৃশ্রদ্ধাবোধ, দায়বোধ, রুচিবোধ ও কর্তব্যবোধের বিবিধ আদর্শ। “ট্যাং কবিতা অন্তর্মাধুর্য” শিরোনাম-বিধৃত ভূমিকাবক্তব্যে অনুবাদক গৌরাঙ্গ মোহান্ত চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াসের ‘অ্যানালেক্টস’ এর সূত্র উল্লেখ করে পাঠকমহলকে জানান যে কনফুসিয়াস চীনা জনগণকে কবিতা বিরচনে ও কবিতা পঠনে উদ্বুদ্ধ করে জাতিগতভাবে কবিতাপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, যে দৃষ্টান্ত অনুকরণীয়। কবিতাপ্রেম চীনা জাতিকে মহিমান্বিত করেছে, শ্রেষ্ঠত্বের পরাকাষ্ঠা দান করেছে। কনফুসিয়াসের মতানুসারে যেসব বৈশিষ্ট্যধারণ একটি জাতিকে শ্রেয়ঃগুণে গুণান্বিত করে – তার মধ্যে রয়েছে আন্তরিকতা ও বিদ্যানুরাগ; পার্থিব ভোগবিলাসের প্রতি সর্বনিম্ন আসক্তি; অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ; পিতামাতার প্রতি দয়ার্দ্রতা; প্রার্থনাগীতি (আরতি) ও কবিতাচর্চা। কনফুসিয়াস তাঁর পুত্রের প্রতি নির্দেশ দিয়েছিলেন যে তিনি (পুত্র) যদি কবিতা পাঠ না করেন, তা হলে মানুষের সঙ্গে কেমন করে কথা বলতে হয় – তা জানা যাবে না; আর যদি প্রার্থনাগীতি ও আরতি (Ritual) জানা না থাকে, তা হলে সমাজে কোনো অবস্থান সৃষ্টি করা তার পক্ষে আদৌ সম্ভবপর হবে না (অ্যানালেক্টস ১৬:১৩)।
অনুবাদক গৌরাঙ্গ মোহান্ত জানান, ট্যাং যুগে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় কিংবা রাজপ্রাসাদের গুরুত্বপূর্ণ কর্মে নিয়োগদানের জন্য কাব্যপ্রতিভা মূল্যায়িত হতো। আমলা বা কর্মকর্তাগণের মূল্যায়নপর্বে কবিতা রচনায় দক্ষ ব্যক্তি চাকরিলাভে সক্ষম হতেন। চীনা জাতি কবিতাপ্রেম থেকে যে স্বর্ণময় অর্জন নিশ্চিত করেন, সে সম্পর্কেও অনুবাদক সুস্পষ্ট মন্তব্য উপহার দিয়েছেন তাঁর ভূমিকাবক্তব্যে। অনুবাদক বলেন, “ট্যাং রাজবংশ দীপ্তিময় সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল রচনার জন্য পৃথিবীর ইতিহাসে প্রোজ্জ্বল। সামন্ততান্ত্রিক এ শাসনামলে নাগরিকগণ নির্বিবাদ পরিবেশে জীবন ধারণ করেছেন। রাত্রিকালে তাদের দরজায় অর্গল লাগাতে হয়নি। হৃত দ্রব্যাদি পথেঘাটে পড়ে থাকলেও লুব্ধতাবশত কেউ তা স্পর্শ করেনি। নারীর সমমর্যাদা সমাজে ছিল প্রতিষ্ঠিত।”
অনুবাদক তাঁর ‘ঝলকে ওঠা স্বপ্নডাঙা’ অনুবাদগ্রন্থটির অভিপ্রায় প্রারম্ভিকায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। সমাজ রূপান্তর সম্ভাবিত করে তোলা সাহিত্যিক ও কবিদের অন্যতম প্রধান কাজ। কবিতা কোনো বিলাস ও বিনোদন নয়, বরং মানুষের বিদগ্ধায়নের শিল্পসৌরভ। শুদ্ধতা ও নান্দনিকতার অভিযাত্রায় ঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারে কবিতা। পোড়োজমিনে স্বর্ণচাষের শুভ প্রনোদনা জোগাতে পারে কবিতা। একজন কবিসুলভ জাতীয় নেতার মহাকাব্যিক উচ্চারণের ওজাস্বিতা আগুন লাগিতে দিতে পারে বনে বনে, মনে মনে। একজন এজরা পাউন্ড চীনা কবিতার অনুবাদকর্ম ‘ক্যাথি’ (Cathay) প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে আধুনিকতার পরশমণি ছুঁয়ে দিতে পারেন টি এস ইলিয়ট, ডব্লিউ বি ইয়েটসদের চিত্তলোকে, যা জগৎ মাতিয়ে দেয় শতাধিক বর্ষব্যাপী, আজকের দিন অবধি। ঝ্যাং টিং-চেন ও ব্রুস এম, উইলসন অনুদিত ‘100 Tang Poems’, এ.সি. গ্রাহাম কর্তৃক ভাষান্তরিত ‘Poems of the Late T’ang’ এবং ডেভিড হিনটন অনূদিত ও সম্পাদিত ‘Classical Chinese Poetry: An Anthology’ – এই তিনটি বইয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত কবিতাসমূহ থেকে বাছাই করে ৬৩টি চীনা কবিতার বঙ্গানুবাদ করেছেন গৌরাঙ্গ মোহান্ত। ইংরেজি ভাষাকে Lingua Franca এবং Open Sesame  হিসেবে সর্বসম্মত মাধ্যম বিবেচনা করা হয় বিধায় Source Language Text হিসেবে এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। যেসব চীনা কবিদের কবিতা এ অনুবাদ সংকলনে স্থান পেয়েছে, তার মধ্যে রয়েছেন: লুও বিন-ওয়াং (৬৪০-?), ওয়াং বো (৬৫০-৬৭৬), চেন জিয়ান (৬৬১-৭০২), ঝ্যাং রো-জু (৬৬৬-৭২০), ওয়াং ঝি-হুয়ান (৬৮৮-৭৪২), মং হাও-রান (৬৮৯-৭৪০), ওয়াং ওয়েই (৭০১-৬১), লি বাই (৭০১-৬২), ডু ফু (৭১২-৭০), লিউ য়ু-শি (৭২২-৮৪২), ওয়েই ইয়ং-য়ু (৭৩৭-?), লি য়ি (৭৪৮-৮২৯),  চ্যাং জিয়ান (জন্ম আনুমানিক ৭০৮), মং চিয়াও (৭৫১-৮১৪), হান য়ু (৭৬৮-৮২৪), জু তাও (৭৬৮-৮৩১), ওয়াং জিয়ান (৭৬৮-৮৩৩), লি শেন (৭৭২-৮৪৬), বাই জু-য়ি (৭৭২-৮৪৬), লিউ জং-উয়ান (৭৭৩-৮১৯), ঝ্যাং জি (৭৬৬-৮৩০) য়ুয়ান ঝেন (৭৭৯-৮৩১), লি হো (৭৯০-৮১৬), ডু মু (৮০৩-৮৫২), ওয়েন টিং য়ুন (৮১৩-৮৭০) লি শ্যাং- য়িন ( ৮১৩-৮৫৮), ডু শান- হে (৮৪৬-৯০৪), পিউ এ সিয়ো (৮৩৪-৮৮৩), ওয়াং চ্যাং লি (?-৭৫৬), লু গুই মেং (?-৮৮১, ঝ্যাং মি (তারিখ অজ্ঞাত), ঝাও ও (তারিখ অজ্ঞাত)। কালের বিবেচনায় লক্ষণীয় যে অনুবাদের জন্য বিবেচিত চীনা কবিতাগুলো বাংলা সাহিত্যের আদিতম নিদর্শনরূপে স্বীকৃত চর্যাগীতিকাসমূহেরও পূর্বে রচিত। ট্যাং যুগের এসব কবিতা ভাবসম্পদের দিক থেকে যেমন, সারমর্মিতা, অলংকার, প্রতীকবাদ এমনকি পরাবাস্তববাদের চর্চার দিক থেকেও কালের গণ্ডি অতিক্রম করে ধ্রুপদী চারিত্রে সমুজ্জ্বল আবেদন সহকারে উপস্থিত। ঝ্যাং রো-জু (৬৬৬-৭২০) এর কবিতা ‘বসন্ত, নদী, পুষ্পগুচ্ছ, চাঁদ: রাত’ (Spring, The Rives, Flowers, The Moon: Night) এর শেষ স্তবকটিতে চীনা কবির সত্যিকার অভিপ্রায়টিই উপস্থাপিত হয়েছে বলে প্রতীত হয়। যেমন, আমরা বর্তমান বঙ্গানুবাদটিতে পড়ি:
“কোন নিঃসঙ্গ রমণীর ছাদ থেকে চাঁদ কিরণ ঢালে?
ঘরের ওপর আলো খেলছে করুণ খেলা,
সরে যায় কারো ফেলে রাখা ড্রেসিং টেবিলের ওপর।
কাপড়-কাচার কাষ্ঠখণ্ড হতে সরাতে কিংবা
অন্ধের শরীরে গড়িয়ে পড়া থেকে একে রোধ করা অসম্ভব।”
এই কবিতাটির সমগ্র আবহ এবং উধৃত অংশটুকু থেকে স্পষ্ট হয় যে, প্রকৃতির তাবৎ ঐশ্বর্যই সামাজিক সাম্যবাদের বাহক হয়ে মানুষের দুয়ারে এসে উপস্থিত হয়। কোনো বৈষম্য সেখানে নেই। একই বসন্ত, একই নদী একই পুষ্পগুচ্ছ, একই আকাশ ও চাঁদের আলো উচ্চবিত্ত নি্ম্নবিত্ত, ধনিক ও শ্রমিকদের ওপর বিতরিত হয়। অন্ধ বা বিকালাঙ্গও এই সাম্যবাদী বিতরণ ব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত নয়। চীনা কবি বলেছেন,
“অন্ধের শরীরে গড়িয়ে পড়া থেকে একে রোধ করা অসম্ভব।”
কবিতাটিতে রোমান্টিকতা আছে, কিন্তু সে রোমান্টিকতা ভাবের ফানুস ভাসিয়ে দেয় না, বরং প্রাকৃতিক সম্পদের স্বভাবজাত সমীভবন সৃষ্টির প্রয়াসে নিরন্তর ক্রিয়াশীল। পারসনিফিকেশন ধরণের অলংকারের অসাধারণ নৈপুণ্যে আমরা বঙ্গানুবাদ পড়ি:
“মনে হচ্ছে অস্তায়মান চাঁদ নদীতীরের পুষ্পপ্রসূ গাছকে
অশান্ত চিন্তা নিয়ে ঝাঁকা দিচ্ছে।”
ওয়াং ওয়েইর কবিতা :
‘আমার পাহাড়ি আবাসে শরৎ সন্ধ্যা’ (An autumn Evening in My Mountain) কবিতাটির বঙ্গানুবাদে ধরা পড়েছে দৃশ্যকল্প, শব্দ বা ধ্বনির চিত্রকল্প এবং গন্ধ বা সুরভির রূপকল্প:
“পদ্মগুচ্ছ করে থর থর: জেলে নৌকা নেমে পড়ে।
হবে যখন, বসন্তের সৌগন্ধ হোক নিঃশেষিত; “
নিসর্গের অবারিত ঐশ্বর্যরাশির বিলোল বর্ণনায় ব্যঞ্জনাঋদ্ধ এই কবিতাটি। প্রতিটি চিত্রকল্পই বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে বঙ্গানুবাদের প্রাঞ্জলতায়।
লি বাইয়ের কবিতা ‘চাঁদের নিচে নিঃসঙ্গ সুরাপান’, (Drinking alone under the Moon) বাংলা সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন চর্যাগীতির ৫০ সংখ্যক কবিতার আবহের সাথে আশ্চর্যরকম সাযুজ্যে সমৃদ্ধ। চর্যাটিতে পাহাড়ি এক কন্যা কঙ্গুচিনার রস থেকে চোলাই মদ তৈরি করে পানোন্মত্ত হয়, টিলার ওপর নির্মিত ঘরে বসবাস করে, উপভোগ করে প্রকৃতির অবারিত সৌন্দর্য। লি বাইয়ের এ কবিতাটির নায়ক একা আকণ্ঠ পান করে জগভর্তি মদ, কল্পনায় সঙ্গী করে নেয় তার নিজের ছায়া ও আকাশের চাঁদকে। রোমাঞ্চিত নায়কটি নাচে আর গায় উচ্ছ্বাসময় কল্পনায় সঙ্গী করে নেয় চাঁদ আর আপন ছায়াকে। চাঁদ ও ছায়ার উপস্থিতি অবাস্তব নয়, বরং খুবই বাস্তব, কিন্তু কাব্যিক বর্ণনাটিতে উচ্ছ্বাসের অতিরঞ্জন ও  Personification  সেই বাস্তবতার পানপাত্রে ঢেলে দেয় কল্পনাদূর ইন্দ্রজাল, তারপর ম্যাজিক রিয়ালিজমে উড়ে-যাওয়ার বর্ণনা, Ecstasy-তে আরোহন:
“চলো ছায়াপথ পেরিয়ে হই সম্মিলিত”।
মূল কবিতার অন্তর্লোকের ভাষা থেকে উদ্ঘাটিত এই অর্থ উদ্ধার ও অনুবাদ পাঠককে চমৎকৃত করে। চর্যাগীতির ৫০ সংখ্যক কবিতার সমগোত্রীয় আর একটি কবিতা ডু ফু রচিত ‘বন্ধুর দেখা সাক্ষাৎ’ (A Friend Visits), যেখানে ভাস্বর হয়ে ওঠে এ পঙক্তি; ‘এবং আমাদের পানের জন্য রয়েছে বাড়ির চোলাই করা মদ।’ লি বাই এর কবিতা ‘লুয়াঙে বসন্ত রাতে বাঁশি শুনে’ (Hearing the Flute on a Spring Night Luoyang) কবিতাটি মেলবন্ধন ঘটিয়ে দেয় চীনা পাহাড়ি খাড়াই উৎড়াইয়ের লোকজ সংস্কৃতির সাথে উত্তরবঙ্গের উত্তর প্রান্তিকের খাড়াই-উৎড়াই এলাকার সংস্কৃতির। চীনের একটি প্রান্ত তো ভৌগোলিকভাবে ছুঁই ছুঁই করেছে ভুটান ও উত্তরবঙ্গকে, যে উৎস থেকে ভোট-চীনা সংস্কৃতি ও ভাষার উদ্ভব ঘটেছে নৃতাত্তি¡কদের গবেষণায়। বর্তমান কবিতাটির প্রাণে ঝংকার তুলছে যে বাঁশির সুর, সে বাঁশির সুরে আমি পাচ্ছি আমার ভাওয়াইয়া গানের ভাষা ও আর্তি:
“ভঙ্গুর উইলো শাখার গান চিনতে পেরে
কে বাড়ির চিন্তায় স্থির থাকতে পারে?”
তুলনীয় হরিশ পালের সংগ্রহে কেদার চক্রবর্তীর কণ্ঠে গীত ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে রের্কডকৃত ভাওয়াইয়া:
“কালা, আর না বাজান বাঁশরী রে
সাধের ঘরে কালা রইতে না পারি।।
ওরে তোর কালার বাঁশরীর সুরে
ওরে, নারীর মন মোর না রয় ঘরে
ক্যান রে কালা বাজান বাঁশি সাঁঝে সকালে?”

  1. B. Yeats তার Mysticism বিষয়ক বক্তব্যসমূহে একবার বলেছিলেন যে, ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তের প্রান্তিক মানুষ এক অদ্ভূত ভাষাযোগের মাধ্যমে আত্মার সংবাদ বিনিময় করে থাকেন, এর জন্য কোনো যান্ত্রিক মাধ্যমের সহায়তা প্রয়োজন পড়ে না। লি বাই এর এই কবিতা এবং বাংলার ভাওয়াইয়া যেন একই ভাষায় চীন ও বাংলার গভীর মিলন রচনা করে দিয়েছে। লি বাই এর আর একটি কবিতা “Wandering up Ample-gauge Creek on a Spring day”এর বাংলা অনুবাদ ‘বসন্ত দিনে স্বচ্ছ খাঁড়ির ওপর বেড়ানো’। ‘আমি’ দিয়ে শুরু কবিতাটি Subjective ভঙ্গিতে বর্ণিত, যা আধুনিক কবিতার অনুষঙ্গ। কবির এই ‘আমি’ বিশ্বের সকল পাঠক-‘আমি’-কে একাত্ম করে ফেলে:

‘গভীর গিরিখাতের মুখে, আমি গাইছি গান।
সত্বর হবে পথের অবসান।’
কবিতাটিতে আছে মানব অভিযাত্রার পথে দাঁড়ানো বহু প্রতিবন্ধকতার দৃশ্যকল্প, যথা ‘খাড়া পাহাড়’, ‘নবজাত মেঘ,’ ‘অচেনা আগন্তুক’ ইত্যাদি, যা প্রতীকায়িত করে  সম্মুখের অজানা আতংকের ধারাবাহিক উপস্থিতিকে। কিন্তু অভিযাত্রী নির্ভীক যাত্রায় সংকল্পবদ্ধ: ‘প্রবাহের প্রতিকূলে চলি এগিয়ে’ তুলনীয় বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধিত্বশীল কবিতা, রবার্ট ফ্রস্টের ‘Stopping by Woods on a Snowy Evening’ এর নিম্নোক্ত
পঙক্তিনিচয়:
“কাজল গভীর এ বন মধুর লাগে,
কিন্তু আমার ঢের কাজ বাকী আছে।
যেতে হবে দূরে ঘুমিয়ে পড়ার আগে!
যেতে হবে দূরে ঘুমিয়ে পড়ার আগে।”
(শামসুর রহমানের অনুবাদ)
লি বাই এর এ কবিতাটির শেষ লাইনের প্যাথস কাকতালীয়ভাবে সাজুয্য খুঁজে পায় ফ্রস্টের কবিতাটির শেষ লাইনে: ‘অসংখ্য পাহাড়চূড়ার পশ্চিমে অস্তমিত হয় সূর্য’।
গৌরাঙ্গ মোহান্তকৃত গদ্য অনুবাদটির অক্ষর চয়নে লক্ষণীয় ধীর লয়, ক্লান্তিময়তা ও অবসন্নতার প্রকাশভঙ্গী। ফ্রস্টের মূল কবিতায় পাই এই ক্লান্তিময়তার প্রকাশ, Sound Effect সৃষ্টির রিটোরিক ও প্রসোডির প্রয়োগ। অষ্টম শতাব্দীর চীনা কবি ডু ফু-র কবিতা ‘পাথর পরিখা গ্রাম নিয়োগকর্তাগণ’ (Stone Moat Village Recruiters) আর একটি শ্রেষ্ঠ কবিতার উদাহরণ, বিশ্বসাহিত্যের দেড় হাজার বছরের ইতিহাসে। বর্তমান অনুবাদে এর পাঠ:
“ইয়েচেঙের নিরাপত্তাবিধানে নিয়োজিত তিন ছেলের মধ্যে
একজন কেবল বাড়িতে পাঠিয়েছে চিঠি।
অন্য দুজন যুদ্ধে হয়েছে নিহত।
উত্তরজীবী যথাসাধ্য কৌশলে লাভ করেছে জীবন;
মৃতরা তাদের নিয়তিকে করেছে নিরুদ্ধ।
আমার দুগ্ধপোষ্য নাতি ছাড়া
এ সংসারে আর কোন পুরুষ নেই।
সে জন্য পুত্রবধু এখনও আমাদের যায় নি ছেড়ে –
তাছাড়া, তার নেই কোনো শোভন পোশাক।
রাতের অন্ধকারে, আমাকে নিয়ে চলুন আপনাদের সাথে।
যদিও আমি দুর্বল বৃদ্ধা রমণী,
হেয়াঙে আমাকে কাজে নিয়োজিত রাখুন –
এখনও আমার রয়েছে সকালের খাবার তৈরি করার শক্তি।
যদিও গভীরতর অন্ধকার গ্রাস করেছে তাদের কন্ঠধ্বনি,
মনে হলো আমি দূরবর্তী সাশ্রু দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনলাম।”
কবিতাটির বঙ্গানুবাদে পরিস্ফুটিত Tragic Sense আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় J. M. Singe এর ‘Riders to the Sea’ এর প্রোটাগনিস্ট Mauriya-র সব হারানোর ব্যথা। মাছ শিকারে গিয়ে একের পর এক তার পিতা, পিতামহ, ও পুত্ররা সমুদ্রের অতল গহবরে হারিয়ে গিয়েছে, অবশিষ্ট রয়েছে একটি মাত্র কন্যা। প্রকৃতির রুদ্ররোষে তারা সবাই চলে গেলেও মারিয়ার সংগ্রামী চিত্ত এখনো প্রবল শক্তিতে অস্তিত্বমান। ডু ফু-র  কবিতায় গৃহযুদ্ধে নিহত সকল ছেলের স্মৃতি বুকে নিয়েও শক্তি ও সাহসের প্রকাশ ঘটান বৃদ্ধা রমণী; তিনি বলেন:
“হেয়াঙে আমাকে কাজে নিয়োজিত রাখুন –
এখনও আমার রয়েছে সকালের খাবার তৈরি করার শক্তি।”
অস্তিত্ববাদী সাহিত্যের আরও এক আধুনিক স্রষ্টা ব্রেখট এর ‘Mother Courage and Her Children ’ এর সাথেও ডু ফু তুলনীয়। ডু ফু অষ্টম শতাব্দীতেও ছিলেন আজকের দিনের আধুনিক কবি-নাট্যাকারদের মতোই আধুনিকতায় সমুজ্জ্বল। প্রকৃতপক্ষে আধুনিকতা বিষয়টি অব্যাহত বা Recurring।  মানব মনন চিত্রণের দক্ষতায় ও গভীরতায় এলিজাবেথান কবি শেকস্পিয়ার বিশ শতকের এলিয়েটর তুলনায় পিছিয়ে ছিলেন না। Soliloqueiry গুলোতে বিধৃত Inner Conflict, সাম্প্রতিক কালের আধুনিক সাহিত্যের Alter-ego পদ্ধতির তুলনায় কম কার্যকর নয়। সাহিত্যে গড়ফৎবহরংস ব্যাপারটি সব যুগে সব কালে প্রতিভাবান কবিদের কবিতায় খুঁজে পাওয়া সম্ভব। অনুবাদক যদি Source Text-এর Intention অনুধাবন করতে পারেন, তা হলে অনূদিত কবিতাতেই সে আস্বাদন উৎপাদন করা যেতে পারে, যেমন করেছেন চীনা কবিতার বর্তমান অনুবাদে গৌরাঙ্গ মোহান্ত। বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের সম্পাদকীয় ভূমিকায় যাকে বলেছেন, ‘পরিবর্তনমান আধুনিকতা’, সম্প্রতি মুহম্মদ নরুল হুদা সেটাকে বলেছেন Metamodernism, ‘অব্যাহত আধুনিকতা’। এ ছাড়া ডু ফু -র কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে বিংশ শতাব্দীর বহুল আলোচিত কবিতা বৈশিষ্ট্য ‘Alienation’ ‘নিঃসঙ্গতা’। ডু ফু-র কবিতা ‘ভ্রমণে নিশীথ চিন্তাভাবনা’(Night Thoughts on a Journey)-র বর্তমান বঙ্গানুবাদে আমরা পড়ি:
“নিভৃত নিশীথে নিভৃত নিশীথে, উচ্চ-মাস্তলযুক্ত নৌকা।
নিঃসীম ভূতলের প্রান্ত রূপে নক্ষত্রপুঞ্জ করে অবতরণ।
চাঁদ ভেসে ওঠে, বহমান বিশাল নদীর ওপর।
আমার কাব্যসৃষ্টির জন্য সুখ্যাত হওয়া কিভাবে সম্ভব?
অফিসের বাইরে, বৃদ্ধ ও অসুস্থ – সামনে পেছনে, এখানে ওখানে
কার সাথে রয়েছে আমার সাযুজ্য, তবু?
নিঃসঙ্গ এক শঙ্খচিল, আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থলে সুস্থিত।”
ডু ফু কবিতায় নিভৃতি ও নৈঃসঙ্গ্য এসেছে অন্তর্বেদনার নিবিড়তম অনুভবে ও প্রতীকতায়। ‘একলা  পাখি’ তাঁর গভীর বেদনার সাথী, যেমন দৃশ্যমান রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ বা ইয়েটসের কবিতায়। ডু ফু তাঁর ‘বসন্ত পরিপ্রেক্ষিত’ (Spring Perspective) কবিতায় বলেন,
“ভয়াবহ বিদায়-গ্রহণ – পাখিরা থমকে দেয় আত্মা।”
রবীন্দ্রনাথ বলেন,
“আকাশে উড়িছে বক পাঁতি
বেদনা আমার তারি সাথী।”
চীন দেশে গৃহযুদ্ধের ফলে সাধারণ নাগরিকগণ বিপন্নতা বোধ করেন, কেউ কেউ দেশের মাটি ত্যাগ করে প্রবাসী হতে বাধ্য হন – “বিপন্ন পুষ্পরাজি বয়ে আনে অশ্রু।” এই সর্বজনীন ক্রন্দনের তীব্র আকুতি যে চিত্ররূপময় প্রতীকধর্মী ভাষায় উচ্চারণ করেছেন ডু ফু, তা সারবত্তাগুণে ও অন্তরাত্মিক আবেদনে অসাধারণ, অতুল্য। আমরা বঙ্গানুবাদে পড়ি আর একাত্তরের শেকড়-ছেঁড়ার বেদনায় এখানে এ ভূখন্ডে আর্ত হই:
“যুদ্ধের গোলযোগ নিয়ে একটানা চলে তিন মাস,
বাড়ি থেকে আসা একটি চিঠি স্বর্ণপ্রাপ্তির ভাগ্যের সমান।”
লিউ য়ু-শির কবিতা ‘পাথুরে শহরে’ (Stone City) আমাদের নিমেষেই নিয়ে যেতে পারে এলিয়টের “Rocks, rocks and no water” এর বিবর্ণ কংকরাকীর্ণ, দীর্ণ নগরে, পোড়োজমিতে। প্রকৃতির দয়াদাক্ষিণ্য না পাওয়া পর্যন্ত নারকীয়, যান্ত্রিক যন্ত্রণার অবসান ঘটে না। কিন্তু লিউ য়ু- শি তার কবিতায় শেক্সপিয়ারীয় সমঝোতায় দয়াশীল; তিনি উপহার দেন বৃষ্টি, সংগীত, ঘুম ও নিসর্গশোভা। বর্তমান অনুবাদভাষ্যে গৃহযুদ্ধ পরিবৃত, পরিক্লিষ্ট নগরীটি তবু বেঁচে থাকে:
“পুরনো রাজধানী পরিবেষ্টনকারী পর্বত এখনও সবুজ।
নিঃসঙ্গ জোয়ার শূন্য শহরে এখনও ছিটিয়ে দেয় জল।
হুয়াই নদীর ওপর, পূর্ব দিকে ওঠে বহুদর্শীর চাঁদ;
রাতের গভীরে এখনও এটি শক্ত বেড়াকে উপেক্ষা করে।”
রবীন্দ্র কাব্যনাট্য চণ্ডালিকার সেই ‘জল দাও, মোরে জল দাও’ কবিতা জোয়ার জলের অঢেল বৃষ্টিকণা ছিটিয়ে দেয়; পূর্ব আকাশে হাসে ঘুমপাড়ানী চাঁদ; সবুজ এখানে জীবনের অমোঘ প্রতীক। আমরা প্রত্যক্ষ করি যে প্রতীকতা এসব কবিতায় কত বেশি সোচ্চার সক্ষমতায় উত্তীর্ণ। আলোচ্য কবিতার শেষ পঙক্তিটিতে যন্ত্রদানব ও মানবত্রাস ‘বেড়া’ উপেক্ষা করে আবির্ভূত সবুজ, জল ও চাঁদের জয়যাত্রার উল্লেখ লক্ষণীয়। আধুনিক টি.এস. এলিয়ট যেখানে ধর্ম অভিমুখী, ইয়েটস অ্যান্টিক্রাইস্টে বিশ্বাসী, মধ্যযুগের চীনা কবি লিউ য়ু-শি সেখানে এক ধাপ এগিয়ে নিসর্গের শক্তিতে বা প্রকৃতির গ্রিনে আশ্রয়কামী।
মং চিয়াও এর আট পঙক্তিবিশিষ্ট কবিতা ‘অচিন্ত্যপূর্ব’ (Impromptu) রিয়ালিজম এর পরাকাষ্ঠা উপস্থাপনে ভাস্বর। অনুবাদকের মিতব্যয়িতাগুণে রোমঞ্চ ও বাস্তবতা এখানে কোলাজ শিল্পে অবতীর্ণ। হ্যামলেটের ছুরির আঘাতে নিহত পলোনিয়াস ঘরের কাছেই প্রাণ হারালেন:
“দূরত্বের মধ্যে রাস্তার বিপদ নিহিত নেই
চাকা ভেঙে যেতে দশ গজই যথেষ্ট।”
ওফেলিয়া-হ্যামলেটের প্রেমে ছিল না রমনার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান চষে লাফালাফি অথবা টাইটানিকের তিনতলাব্যাপী কাঁপাকাঁপি। তবু অফেলিয়ার কবরে লাফিয়ে পড়ে হ্যামলেট, কণ্ঠনালী চেপে ধরে শাসিয়ে দয়ে লেয়ার্টিসকে:  “চল্লিশ হাজার ভাইয়ের স্নেহ যোগ দিলেও তা হবে না হ্যামলেটের ভালোবাসার সমকক্ষ”
“প্রেমের বিষণ্ণতা পৌনঃপুনিক প্রেম নিবেদনে নিহিত নেই,
একটি মাত্র সন্ধ্যা আত্মায় রেখে যেতে পারে ক্ষতচিহ্ন।”
‘যাত্রিকের গান’ (A Journeyer’s Song) এ মং চিয়াও মাত্র ছয় পঙক্তির মধ্যেই উপহার দেন আর এক চিরন্তন সত্য, যা কনফুসীয় বাণীর সাথে সাজুয্যপূর্ণ। মা যখন সন্তানের জন্য সুতোয় পোশাক বুনেন, তা কখনো লাভের জন্য করেন না, সন্তানও তা ফেরত দিতে পারে না:
“কচি ঘাস কখনো কি ফেরত দিতে পারে
বসন্ত সূর্যের দয়াময় রশ্মি?”
কনফুসিয়াসের Filial Piety শুধু সামাজিক দায়বদ্ধতা নয়, মহত্তর আরো কিছু যা সৃষ্টি করতে পারে অপার মানবিকতার শাশ্বত উদ্যান, ধর্মগুরুরা কেতাবে পুস্তকে যার নাম রেখেছেন ‘স্বর্গ’। ওয়াং জিয়ান এর কবিতা ‘স্বামী প্রতীক্ষমাণা পাষাণ’ (Awaiting Husband Stone) প্রতীকধর্মী কবিতা, যা বিন্দুতে সিন্ধুর অতলান্তিক গভীরতা কিংবা এক টুকরো পাষাণখণ্ডে বিশাল বিরানভূমির বিস্তার ধারণ করে। এপিক উপমার (Epic Simile) প্রয়োগে লক্ষণীয় আধুনিক প্রবণতা। মাত্র ছয়টি পঙক্তির মধ্যেই খনি আকারে গচ্ছিত এখানে সমগ্র ‘মেঘদূত’ মহাকাব্য। কালিদাসের ‘মেঘদূত’ কাব্যে স্ত্রী থাকে উজ্জয়িনীপুরে, দূরে, যক্ষ স্বামী মেঘকে দূত করে পাঠিয়ে দেয় প্রেম-বার্তা, আত্মার আকুতি, আস্থায় অবিচল সে আপ্যায়ন ও আমন্ত্রণের। আশাবাদে আশ্বস্ত। এ কবিতায় পুরুষপক্ষ বিদেশে, স্ত্রীপক্ষ দুঃখে শোকে পাথর পাষাণ, তবে আশাবাদী যে “শৈলশিখরে বায়ু ও বৃষ্টির চক্রপরিক্রমণ” ঘটবে, পান্থ অর্থাৎ স্বামীর মতিগতির ঘটবে পরিবর্তন, সে করবে প্রত্যাবর্তন:
“এ পাষাণ হতো সরব, যদি পান্থ করতেন প্রত্যাবর্তন।”
বায়ু ও বৃষ্টির পরিক্রমণ যে মানব মনে Eco-friendly Impact সৃষ্টি করে, এমত বৈজ্ঞানিক সত্যের পরাকাষ্ঠা এই কবিতা। অনুবাদক তাঁর অনুবাদভাষ্যে অযথা কলেবর বিস্তার না করে মিতব্যয়ী আয়তনের মধ্যেই ধারণ করেছেন মূলের সমগ্র ভাব ও ভাষা।
বাই জু- য়ির কবিতা ‘পুুরনো সমভূমির ওপর ঘাস: বিদায়ের গান’ (The Grass upon the Ancient Plain: A Song of Parting) পূর্ববর্তী কবিতাটির মতো Eco-balancing বৈভব প্রকাশ করে।
শহরের সমস্ত দেয়াল অগ্নিশিখায় দগ্ধ, ধ্বস্ত, কিন্তু সালোকসংশ্লেষণঋদ্ধ (Photosynthesis enriched)  বৃক্ষরজি শ্যামলিমা, শোভা দিয়ে ক্রমশ আবৃত করে দিয়েছে যাবতীয় ক্ষরণচিহ্ন। Nature is the best healer -এ  হুইটম্যানের ‘Leaves of grass’ রাজনৈতিক কাব্য, কিন্তু বাই জু-য়ির ঘাসঘন  বিদায়ের গান প্রকৃতির বৈজ্ঞানিক ব্যঞ্জনাদীপ্ত অনন্য কবিতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃত আত্মীয়ের স্মরণে স্মরণিকা বা Memorium ধরণের স্মৃতিচারণমূলক কবিতা লিখতেন। এ নিয়ে দার্শনিকতা করতেন না। তিনি টমাস গ্রের ‘এলিজি’ শেলির ‘অ্যাডোনিস’ বা টেনিসনের ‘In Memorium’ ধাঁচের এলিজি রচনার পক্ষপাতী ছিলেন না। মৃত্যু তাঁর কাছে শুধুই ব্যক্তিক পর্যায়ের বিচ্ছেদ  ছিল, সুযোগ বুঝে তা নিয়ে দার্শনিকতা কচলানো তিনি পছন্দ করতেন না। বৌদি কাদম্বরীর মৃত্যু হলে তাঁর স্মরণে তিনি ‘ছবি’ নামে একটি অসাধারণ স্মরণিকা রচনা করেন। আর একটি অনবদ্য গান লিখেছেন তিনি ওই  বৌদিকে স্মরণ করে:
“প্রেম এসেছিল, নিভৃত চরণে
একটি রক্তিম মরীচিকা।”
তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুতে তিনি রচনা করেন একটি অখ্যাত কাব্য ‘স্মরণ’। য়ুয়ান ঝেন (৭৭৯-৮৩১) এর এরকম একটি স্মরণ প্রকৃতির কবিতা ‘স্বপ্ন দেখলেম’ অনুবাদ করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। য়ুয়ান ঝেন এর আরো কবিতা আছে স্মরণ প্রকৃতির যথা ‘বিষাদের প্রকাশ’ (Giving Vent to Sorrow) অনুবাদ করেছেন গৌরাঙ্গ মোহান্ত ।
রবীন্দ্র অনূদিত ‘স্বপ্ন দেখলেম’ ও গৌরাঙ্গ মোহান্ত অনূদিত ‘বিষাদের প্রকাশ’ একই  পটভূমিবিশিষ্ট, একই আঙ্গিকের  Reminiscence;  দুটো কবিতাই Objective Correlative পদ্ধতিতে রচিত। যুদ্ধে নিহত স্বামী বা বন্ধুর পরিত্যক্ত প্রিয় বস্তুগুলি স্মৃতি জাগানিয়া উপকরণ হিসেবে Objective এর ভূমিকা পালন করে, Dream বা  Hallucination এর উদ্রেক ঘটে, যা মানবিক ও চিরন্তনী। পরলোকগত নিকট ব্যক্তি বা আত্মীয়ের জন্য শোক প্রকাশের বাহন হয়ে দাঁড়ায় তার জীবদ্দশায় ব্যবহৃত এটা-ওটা-সেটা। জসিম উদ্দীনের ‘কবর’ কবিতায় এ রকম বহু বস্তুর বর্ণনা ও স্মৃতিচারণা পাওয়া যায়।
প্রথমোক্ত ‘স্বপ্ন দেখলেম’ কবিতাটিতে কুয়োয় পড়ে থাকতে দেখা একটি মাটির ঘড়াকে অবলম্বন করে একটি নারী-হৃদয়ের অস্থিরতা, স্মৃতিকারতা, সান্নিধ্যসন্ধান ও ব্যাকুলতা প্রকাশিত হয়েছে:
“দেখি এক মাটির ঘড়া কালো সেই গহবরে।
দড়ি নাই যে তাকে টেনে তুলি।
ঘড়াটা পাছে তলিয়ে যায়
এই ভেবে প্রাণ কেন এমন ব্যাকুল।
পাগলের মতো ছুটলেম সহায় খুঁজতে।
তিনশো বিঘে পোড়ো জমি,
ভারী মাটি তার, উঁচু উঁচু সব ঢিবি;
নীচে গভীর গর্তে মৃতদেহ শোওয়ানো।
শুনেছি, মৃত মানুষ কখনোকখনো দেখা দেয় সমাধির বাইরে।
আজ আমার প্রিয় এসেছিল ইঁদারায় ডুবে যাওয়া সেই ঘড়া।
তাই দুচোখ বেয়ে জল পড়ে আমার কাপড় গেল ভিজে।”
রবীন্দ্র অনূদিত কবিতাটি চব্বিশ লাইনের। অনুবাদ করতে গিয়ে রবীন্দ্রানাথ লাইন সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি করেছেন, প্রতীয়মান হয়। এরকম উদারতা তাঁর স্বভাবজাত ছিল, যেমন স্বভাবজাত তাঁর অনুবাদ বৈশিষ্ট্য – সেটা আক্ষরিক অনুবাদ অবশ্যই হবে না, হবে রবীন্দ্রালোকিত ভাবানুবাদ। (রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ কবিতা; বদিউর রহমান; মধ্যমা পাবলিকেশন্স, কনকর্ড এম্পোরিয়াম, কাঁটাবন, ঢাকা, ফেব্রু ২০১৬ ; পৃষ্ঠা ২১২)
চীনা কবি য়ুয়ান ঝেন এর ‘বিষাদের প্রকাশ’ পূর্বোক্ত কবিতাটির মতোই একটি Reminiscent কবিতা, যেখানে চীনা গৃহযুদ্ধে নিহত স্বামীর পোশাক আশাক, আসবাবপত্র, নারীসঙ্গ ইত্যাদি এসেছে স্মৃতির অনুষঙ্গ হয়ে,  Objective Correlative হয়ে। পরলোকগত আত্মীয়টির পোশাক-আশাক অল্পকিছুকাল সংরক্ষণ করা হয়, কিন্ত সেগুলো ক্ষয়শীল বন্তু বিধায় বিনষ্ট হওয়ার পূর্বেই দান করা হয় দরিদ্রদের মাঝে। এ সংস্কৃতি চীনে যেমন, বাংলাদেশেও তেমনই। কবিতাটিতে স্ত্রী বলেন:
“আমি তোমার প্রায় সমস্ত পোশাক পরিচ্ছদ বিতরণ করেছি
তবে তোমার সেলাই সামগ্রী টেনে সরাতে পারছি না।”
পরলোকগত স্বামীটির অনেক তরুণী বান্ধবী ছিল। স্ত্রীটি তার হারিয়ে যাওয়া স্বামীর উদ্দেশে সহানুভূতি প্রকাশ করে বলেন:
“তোমার অতীত আসক্তির কথা মনে রেখে
আমি তোমার প্রিয়তমা তরুণীদের প্রতি সদয় হয়েছি।”
স্বপ্নের মাঝে স্ত্রীটি তার স্বামীর সাক্ষাৎ পায়, কিন্তু সম্পর্কসূত্রটি যেন গীতল থাকে, উগ্র না হয়ে যায়, সেই ভব্যতা ও হৃদ্যতার কথা উচ্চারণ করেন স্ত্রীটি:
“…এবং সূত্রকে গীতল হতে বলেছি।
নিশ্চিতভাবে জানি এ দুঃখ সবার সঙ্গী।”
কবিতার শেষ চরণটি তাৎপর্যপূর্ণ । এ চরণটিতে দ্বিচারিণী, জটিল চরিত্র ও অস্বচ্ছ রমণীদের প্রতি ইংগিত করে বলা হয়েছে:
“কিন্তু নিঃস্ব ও সাদাসিধে দম্পতিদের কাছে
জীবন বয়ে আনে বিষাদময়তা।”
এ কবিতায় স্ত্রী চরিত্রটি তার স্বামী নিহত হওয়ার পর থেকে একাকী জীবনযাপন করছে এবং সে সাদাসিধে অর্থাৎ সহজ সরল প্রকৃতির। বিচ্ছেদ বেদনাই তার একমাত্র সঙ্গী, বিষাদময়তার মধ্য দিয়েই তার কালাতিপাত ঘটে। এ ধরণের জীবনযাপন তার একার জন্য, অন্যদের কথা আলাদা। এ থেকে এ চিত্রটিই পরিস্ফুটিত হয় যে চীনা সমাজে দু’ধরণের নারীই ছিল, যেমন ছিল বাংলাদেশে। মধ্যযুগে বাঙালি সমাজ ও চীনা সমাজে নারীর স্বভাবগত  বৈশিষ্ট্যে খুব একটা ভিন্নতা ছিল না। সুস্বাদু গদ্য কবিতায় চীনা কবিতার অনুবাদ উপহার দিয়েছেন গৌরাঙ্গ মোহান্ত; তিনি বাক্য গঠনে ও পঙক্তিবিন্যাসে মিতব্যয়িতার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি নিজে কবি। কবিদের পক্ষেই যথার্থভাবে কবিতা অনুবাদ করা সম্ভব। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাহিত্যে অনুবাদ একটি বিশেষ চর্চারূপে বিকশিত হয়েছে। তবে, একটি অনুবাদ অ্যাকাডেমির অস্তিত্ব না থাকায় ‘নানা মুনীর নানা মতে’ আকীর্ণ এই সৃষ্টিপ্রয়াস। চীনা কবিতার অনুবাদে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখা বর্তমান অনুবাদককে অনুরোধ করবো ট্যাং যুগের কবিতাসহ আরো অন্যান্য চীনা কবিতার অনুবাদের অধিক সংখ্যক সুচারু সংকলন তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে উপহার দেবেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর দীর্ঘায়ু জীবনের সর্বগ্রাসী, সর্বপ্লাবী সাহিত্যচর্চায় চীনা কবিতার ভাবানুবাদেও হাত দিয়েছিলেন, কিন্তু সংখ্যাবৃদ্ধির কাজটা সাফল্যের সাথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি। পারলে ভালোই হতো। বর্তমান অনুবাদক এবং নবাগত অনুবাদকগণ ইংরেজি ভাষাকে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে অথবা চীনা ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করে চীনা কবিতার অধিকসংখ্যক অনুবাদ উপহার দিলে আমাদের সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধিত হবে, আশা করা যায়। ল্যাটিন আমেরিক্যান ও স্প্যানিয়ল সাহিত্যে পারদর্শী ও সফল বাঙালি অনুবাদক বন্ধু রাজু আলাউদ্দিন মধ্যবর্তী ইংরেজি অবলম্বনে বিদেশি সাহিত্যের বাংলা অনুবাদের বিপক্ষে। তাঁর মতে, মূল ভাষায় দক্ষতা অর্জনের পরই Source Language Text থেকে ভাষান্তর বা অনুবাদ করা উচিত। তবে সাহিত্যগুরু রবীন্দ্রনাথ এই রক্ষণশীল পথের অনুগামী ছিলেন না বিধায় আমি উদারনৈতিক মধ্যপন্থায় বিশ্বাসী। আমার প্রত্যাশা, উৎকর্ষে ও সংখ্যায় অগ্রসরমান অনুবাদ-সাহিত্য চর্চায় ধীদীপ্ত জাতীয় ক্ষিপ্রতা প্রযুক্ত হোক এবং এর অদৃষ্টপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হোক।