Recent Posts

Gauranga Mohanta’s Poetry: Secret Dew on Eyeglass

Gauranga Mohanta’s Poetry: Secret Dew on Eyeglass

Gauranga Mohanta’s three collections of poetry titled Adhiprantar Jure Chhayasarir (A Shadowy Figure Pervades the Agonized Prairie, 2009), Sunyata o Palakprobaha (Voidness and the Flow of Feather, 2012), and Trogoner Gan (Songs of a Trogon, 2016) are the focus of this discussion. Of these, Adhiprantar…

A Green Dove in Silence is now available on Amazon.in

A Green Dove in Silence is now available on Amazon.in

Click here and Order Now – Available On Amazon.in

This collection of the select prose poems of Dr. Gauranga Mohanta is a translation from original Bengali into English. The translators have tried to keep the form intact thereby developing their own techniques and ultimately expanded the definition of the prose poem.

Gauranga Mohanta’s Website opening speech by Dr. Syed Manzoorul Islam

Gauranga Mohanta’s Website opening speech by Dr. Syed Manzoorul Islam

প্রমগ্ন কবিতাবলি – গৌরাঙ্গ মোহান্ত (পূর্ণাঙ্গ বই)

প্রমগ্ন কবিতাবলি – গৌরাঙ্গ মোহান্ত (পূর্ণাঙ্গ বই)

প্রমগ্ন কবিতাবলি

গৌরাঙ্গ মোহান্ত

প্রথম প্রকাশ:

ফেব্রুয়ারি ২০১৭

গ্রন্থস্বত্ব: রিনা মোহান্ত

প্রচ্ছদ: মোস্তাফিজ কারিগর

প্রচ্ছদ প্রতিকৃতি: আহমেদ শিপলু

প্রকাশক: শিরিন আক্তার (ছোট কবিতা)

৮৫ কনকর্ড এম্পোরিয়াম মার্কেট, ২৫৩-২৫৪ এলিফ্যান্ট রোড, কাঁটাবন, ঢাকা-১২০৫, বাংলাদেশ। মোবাইল: +৮৮০১৭৭৭৪৭৭৭৪৪

পরিবেশক

বাংলাদেশ: কবি (ঢাকা), বেহুলাবাংলা (ঢাকা); পাঠক সমাবেশ (ঢাকা); কাগজ প্রকাশন (ঢাকা); বাতিঘর (চট্টগ্রাম)। ভারত : পাঠক সমাবেশ (কলকাতা); অভিযান পাবলিশার্স (কলকাতা)।

ISBN 978-984-34-2099-2

মূল্য: ১৫০.০০ টাকা

মুদ্রণ: নতুনধারা প্রিন্টিং প্রেস

২৭৭/৩ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা| ফোন: ০১৭১১ ০১৯৬৯১, ০১৯১১ ২৯৪৮৫৫

Pramagno Kabitaboli (Immersed Poems) by Gauranga Mohanta, Cover Design: Mostafa Karigar, Published in February 2017 by Shirin Akter, Price: 150.00 Taka.

উৎসর্গ

আমার শিক্ষক

পরম শ্রদ্ধাস্পদ ড. বিনয় কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

যাঁর আলো ও ভালোবাসা থেকে পেয়েছি

দৃষ্টিশক্তি।

 

কথামুখ

একটি অল্পভার বইয়ের ভেতর আমার বেছে-নেয়া কিছু কবিতা প্রকাশ করবার জন্য প্রীতিভাজন সৈয়দ মহিউদ্দিন মাসুম উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ নামে একটি প্রচ্ছদও প্রস্তুত হয়ে যায়। ‘শ্রেষ্ঠ’ শব্দটি আমার কাছে ভয়ানক অস্বস্তিকর। মনে হয় অহমিকা ঘোষণার কিংবা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য এটি মোক্ষম প্রকাশ। কবিতা নিয়ে আমার অহংকার করবার কিছু নেই; বাণিজ্য বাঞ্ছনীয় নয়। ‘নির্বাচিত কবিতা’ বাজার-চলতি শিরোনাম বলে প্রচ্ছদে ‘প্রমগ্ন কবিতাবলি’-র রাজত্ব মেনে নেয়া গেলো। বইটির অধিকাংশ কবিতা চলিষ্ণু গদ্যে নির্মিত। এখানে মেটনিমি ও মেটাফরের ভেতর দিয়ে জেগে ওঠে একটি ব্যক্তিগত ন্যারেটিভ যেখানে অন্তর্গত অস্তিত্বের সাথে অপর সত্তা বা প্রকৃতিপ্রবাহের সম্পর্ক যোজিত।

অনেক অ্যান্টিপোডাল প্রবণতা নিয়ে গদ্য কবিতা এগিয়ে চলছে। এতে নিশ্চিত হচ্ছে কবিতার প্রসারণস্বাধীনতা। বাক্যের শক্তি গদ্য কবিতাকে অনন্য করে তুলছে। বাক্যের উজ্জ্বল দিন কবিতাকে করবে প্রিয়তর।

 

গৌরাঙ্গ মোহান্ত

ঢাকা, ২৮ জানুয়ারি ২০১৭

 

 

পানকৌড়িবোধ

পানকৌড়িবোধ নিয়ে নিমজ্জিত থাকি; একটি মাছের উজ্জ্বলতার পাশে দেখি জলজ রাজ্যপাট। দেখার জন্য নিমজ্জনকে অত্যাবশ্যক ভাবি। মৎস্যমগ্নতা প্রতিনিয়ত ঘটায় শ্বাসপ্রকৃতির রূপান্তর। উজ্জ্বল মাছের ব্যক্তিগত আয়নায় প্রতিফলিত হয় পানকৌড়ি চিহ্নিত পথ। পানকৌড়ির সাথে মাছের অতিপ্রাকৃতিক যোগ প্রস্তুত করে গভীর রং। এ রং মৃত্যুপূর্ব প্রসারতার জন্য জরুরি। আমার কৃষ্ণতা পানকৌড়ির ঐশ্বর্যে রঞ্জিত। আমার প্রার্থনার ভেতর মাছের অলৌকিক পুচ্ছের অবিকল্প বিকিরণ।

 

সংখ্যাপদ্ম

আমার অর্জিত সংখ্যার ভেতর মেঘযাত্রা। নীল জুড়ে বিস্তৃত সংখ্যাগুলোর কাছে নিরাকার বাতাসের আনাগোনা। বর্ণময় মেঘ পথরেখায় রেখে যায় সজল সাক্ষ্য। মেঘ আছে বলেই অন্তর্গত ড্যাসবোর্ডে তুমি দেখে নিতে পারো সচিত্র যাত্রাজ্যামিতি। সংখ্যাচরিত্র মনস্তাত্বিক, কোথাও এদের সর্ম্পূণ প্রতিফলন নেই; না শিশিরে, না অপরাজিতায়। বুদ্ধধ্যানের ভেতর ফোটে সংখ্যাপদ্ম। প্রতিটি পদ্মের বর্ণ ও বিকাশকালের বৈভিন্ন্য শ্রম, প্রতীক্ষা ও বেদনাকে জাগ্রত করে। আনন্দ অপ্রকাশ্য বেদনায় রূপান্তরিত হয় বলে সংখ্যাবর্ণ বিচিত্র — এ রহস্য তোমার অজানা নয়। বস্তুত প্রতিটি সংখ্যা যৌথ ফল; একমাত্র সহযোগী তোমার ধ্যানদীপ্তি। এ কথা জেনে গেছি, আমাদের মৃত্যুর সাথে সংখ্যাতত্ত্বের অবসান নিশ্চিত, প্রজন্মান্তরে তা প্রচারিত হবার কোনো সুযোগ নেই।

 

দুর্ভিক্ষদিনে তোমার কৌশিক বস্ত্র

দুর্মূল্য দুধকলার গন্ধ ভেসে এলে তোমার দিকে তাকাই। মানকচুছত্রের ঔদার্যে শটি-সোনালু পথে ভেসে আসা স্বাদ ও শব্দের  কাছে তুচ্ছ হয়ে পড়ে সিফুড কিংবা জীবনানন্দীয় চিত্রকল্প। আমার দুর্ভিক্ষদিনে তোমার কৌশিক বস্ত্র উড়ে আসে আমার ধূসর গৃহে। স্কাইট্রেন কিংবা বিমানএঞ্জিনের ক্রমাগত হুঙ্কারের ভেতর তোমার বাক্যদল ভেসে আসে উন্মাদ মেঘে। মেঘের উপস্থাপন শতভাগ অকৃত্রিম নয়; দ্রুতগতির সাথে মেঘ ছিঁড়ে যেতে থাকে আর তোমার উচ্চারণকে করে তোলে কিছুটা অস্বাভাবিক। তবুও শূন্যতার ভেতর মেঘের করুণাই বিস্ময়কর। সূর্যতপ্ত মেঘ স্মৃতিকে প্রোজ্জ্বল করে; মেঘ ও সূর্যের ভেতর তরঙ্গিত হতে থাকে তোমার অবিনাশী শরীর ।

 

মাছের সৌন্দর্যছায়া

ইভাসকুলার লেক থেকে মাছ উঠে আসবে বলে আমি হিমার্ত প্রভাত থেকে বসে থাকি ধবল বার্চের নিচে। কাদার গহন আশ্রয় থেকে শরীর ভাসাতে সময় লাগবে জেনে আমি বনের দীর্ঘতার দিকে দৃষ্টি ফেরাই — বসন্তের অবসন্নতার ভেতর কুয়াশা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সূর্য লজ্জিত; কুহকী আঁধারে ডুবে আছে বন। আমাকে ভিজিয়ে যায় অতি শীতল সাহসী বৃষ্টি। উঁচু বৃক্ষরাজির দুর্বল শাখা শীতফোবিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। অবিস্তীর্ণ পার্ক ও পাহাড় পথে যুবক-যুবতীরা নেমে পড়ে —  লেকের গভীরে ঘন্টা বেজে ওঠে। মাছেরা জলবক্ষে সাঁতার দিয়ে যায়। আমি অজস্র মাছের ভেতর অনন্ত সৌন্দর্যের ছায়া দেখি; রক্তের উজ্জ্বলতার জন্য ছায়াকে জরুরি বলে চিনি।

 

কার্ল প্লেস পার্ক

আমার শূন্য অন্ধকারে তুমি ফিরে আসো, অর্থাৎ তোমাকে টেনে আনি। প্রলম্বিত অন্ধকারে মেঘকণা আয়না হয়ে ওঠে। আমার জন্যে নেমে আসা নক্ষত্রআলো তোমাকে প্রতিফলিত করে — আশ্চর্য  গতিময় প্রতিফলন খুলে দেয় সমস্ত দরজা। আমি সিঁড়ি বেয়ে নেমে পড়ি কার্ল প্লেস পার্কে। সবুজ লতায় বাক্সময় হয়ে ওঠে নক্ষত্রফুল; কর্তিত ঘাসের শরীর শোনায় নবজন্ম উপাখ্যান। অলৌকিক গন্ধে কেঁপে ওঠে পার্ক, বাতাস, বসবার কাঠবেঞ্চ। আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রার্থিত ফলের দীপ্তি। আমার সমস্ত কোষে তখন গন্ধদীপ্তির অদৃশ্য আলোড়ন।

 

অন্ধকার ও দাহস্মৃতি

অন্ধকারে জেগে থাকে দূর শহরের ক্ষীণ আলো। শহরদাহ নয়, দাহস্মৃতি আমাকে বিষণ্ন করে রাখে। সারাদিন কোরীয় পাহাড়ের রক্তপল্লব আমাকে উদ্দীপ্ত করেছে, দাহ অনুষঙ্গ চেতনায় ছড়িয়ে দেয়নি হেমলক ছায়া। সূর্য মৃত্যুকে ঢেকে রাখে, অন্ধকারে সূর্যরেখার অদৃশ্য গতির দিকে চেয়ে থাকি। আমার দৃষ্টিপথে ভেসে আসে তোমার দীপিত বস্ত্রখণ্ড। একদিন অরণ্যসরোবর আলোকময় মাছে মুখর হয়ে উঠেছিলো। তোমার স্পর্শে  আমার আবরণধূলি নক্ষত্রপালকের লাবণ্য ধারণ করেছিলো। আলোকপ্রবণ মাছের প্রাত্যহিক উৎসবে তোমার নক্ষত্রনাম কীর্তিত হয়; আমার প্রত্যাশী পরিচ্ছদে লেগে থাকে বিরামপুরমৃত্তিকা। লাবণ্যকামনাময় ধূলি আমাকে অন্ধকারে উৎসাহী করে তোলে। আমি একটি নামে ঢেকে রাখি অনন্ত দাহস্মৃতি।

 

অন্ধকার ও ট্রোগনের গান

আবির্ভাবের চেয়ে প্রস্থান নিশ্চিত — এ ঘোষণা পানকৌড়ির অন্ধকার পাখায় প্রতিধ্বনিত হয় বারংবার। চঞ্চল বাতাসের রংধনুগতি কে চিরকাল দেখে থাকে? কৃষ্ণচূড়ার হলুদ পাতার বিষণ্ন বৃষ্টি যখন অতিথিভবনের প্রাঙ্গনে নেমে আসে, ট্রোগন গেয়ে ওঠে মেঘরং শূন্যতার গান। স্মৃতির সূক্ষ্ম আধার একদিন বাতাসে থাকবে ভেসে। কোনো নিভৃত গৃহে নয়, গৃহহীন অনন্ত শূন্যতার মাঝে শোনা যাবে ক্রন্দনধ্বনি, দৃশ্যমান হবে অশ্রুজল! পৃথিবী কি বৈপরীত্যের আধার? জীবন-সূর্য ও মৃত্যু-তুষার নির্বিরোধ কি? আনন্দ আছে বলে কি অশ্রুপাত? নির্লিপ্ত যিনি তাকে কেনো কাঁদতে হয়? মৃত্যুপ্রবণ মানুষের সংরাগী হওয়া সাজে না; আত্মায় জাগিয়ে রাখতে হয় বিনাশ ও আর্তনাদের আইলাস্ফীতি। জীবিতের জন্য জীবন এবং মৃত্যু — দু-ই মনোভারের কারণ। আমার জানালার পাশে সবুজ কাঁঠালপাতা একদিন ভুলে যাবে নৃত্যের সরল মুদ্রা; দুপুরে ঘুঘুর মায়াময় সরবতা মিশে যাবে দেয়ালের শেওলা নির্জনতায়, ধূসর আকাশের নিশ্বাস ছুঁয়ে ক্লান্ত বলাকা ফিরে আসবে না বৎসলা বাঁশবনে। সেদিন কোনো সুদীপ্ত শকট ফিরে আসে যদি, নিভৃত গৃহের বিবর্ণ অঙ্গন হতে নিয়ে যাবে একবুক তুষারগ্রস্ত রিক্ত বাতাস! পরিপক্কতার কাল স্বল্পায়ু ও অবর্ধিষ্ণু। প্রস্থানবিন্দু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হবার আগে কালকরবীর অনন্য আভায় পথরেখা চিনে নেয়া জরুরি। আমি জেনেছি, পথের ধুলো দুর্মূল্য জাফরান-রেণু। জয়নুলের চশমা হতে আজও ঝরে পড়ে অদৃশ্য ঝোরার হাহাকার। যমুনাবক্ষের ভেজা বালুর মূল্যহীন সরসতা নিয়ে তরঙ্গিত হই; কালজ্ঞ ভাটির চিমনি কখনো হরিদ্রাভ খামে ভস্মগন্ধি বার্তা পাঠায় — আমি কালের অন্তস্থ সঙ্গীতে নিমগ্ন হতে থাকি। সোনালু পাতায় মোড়ানো পিঁপড়ের পেলব আবাসে করি বাস। দিগন্তচারী ধূসর ঈগল একদিন ঠুকরে খাবে আমার স্বাদু শরীর; আমি সে দৃশ্য দেখবো শুধু, ব্যাখ্যার পাবো না সময়। কালের দিকে করি করুণ নেত্রপাত। পাথুরে মূর্তির নিস্পন্দ চোখ, বাক্যহীন ওষ্ঠাধর, হৃৎপিণ্ডহীন শীতল অবস্থা হতে পারে অনুভবময়। স্পর্শানুভূতিহীন জীবন কি মৃত্যুর সমান? উৎস ও অনিবার্যতার মধ্যকালে সংবেদনার প্রাকৃত রূপায়ন মানুষের শ্রেষ্ঠ কীর্তি। প্রাপ্তি চেতনাবাউলকে পূর্ণতার চেয়ে শূন্যতার দিকেই নিয়ত করে চালনা। শূন্যতা ত্বরান্বিত করে মহাশূন্য মৃত্যুর প্রস্তুতি। অন্ধকার মৃত্যুর ধ্বনি তোলে; আলোয় জাগে তার প্রতিধ্বনি।

 

কুয়াশা কিংবা ব্রিজ

কুয়াশা কিংবা ব্রিজ আমাকে বিভ্রান্ত করে রাখে। কৃষ্ণচূড়া ফল চিরন্তন পথের পরিচায়ক হতে পারে না জেনেও আমার রেটিনা গ্রহণ করতে পারেনি ভিন্ন কোনো দৃশ্যসংবাদ। যে পথ গ্রহণকামী তা দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে ওঠে। অস্পষ্টতার ভেতর কখনো জলবিভাজনের শব্দ শোনা যায়। সাদা ও কালো ডানার পাখি শাসন করে খণ্ডিত আকাশ। আকাশের অপূর্ণতার দিনে বুদ্ধিশূন্যতা তীব্রতা ধারণ করে। অবরুদ্ধ আলোর ভেতর প্রত্যেকটি ব্রিজ নির্দিষ্ট মলুহা রাগ অনুশীলন করে। নির্দিষ্টতাও ডেকে আনে বিপন্নতা। নদী পেরিয়ে গেলে কি স্পষ্ট হয় রুপালি নদীরেখা? মাছের নীরব আনন্দ অদৃষ্ট জলধারাকে পরিশ্রুত করে কিনা, আমি জানি না।

 

শূন্য বাড়ি

পড়ে আছে শূন্য বাড়ি। সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাই দোতলার কবিতাকক্ষে। রবীন্দ্রনাথের হৃদয়স্রোতে একদিন আমরা রংধনু ডুবিয়ে দিয়েছিলাম। ভেজা রংধনুর চাপগুলোকে আলাদা করতে আমাদের সময় লেগেছিলো। আজ আলমিরার গায়ে লেগে আছে মলিন ধুলো। বাংলা অভিধান কিংবা মৃদুল দাশগুপ্তের কবিতা ভুলে গেছে সূর্য ও শ্বেতপদ্মের সাহচর্য। নিচতলায় বন্দি রবীন্দ্র-রচনাবলি — স্বচ্ছ কাচের আড়ালে তরঙ্গের স্থিরতা! অন্ধকারে অন্দর দরজা খুলে মোবাইল-আলোয় দেখি গহন বাগান — প্রাচীরে শিমের রাজত্ব, সবুজের আহ্বান।

 

কৌশলশক্তির অবশতা

কখনো কখনো নিজেকে চেনাবার প্রয়োজন থাকে না। সামাজিক কৌশলশক্তির ভেতর অবশতা রয়েছে, তার রূপ চোখে পড়ে। যে সুর বা নিবন্ধন যোগ সৃষ্টি করে তা সীমাচিহ্নের বাইরে যেতে পারে না। বাইরে নিবন্ধন জরুরি নয়; ব্যক্তিমানুষ নিবন্ধন-ফরম সংশোধন বা বিনষ্ট করেন। এতে সূর্য সোজা চলতে শেখে, চাঁদ কিরণ ঢেলে আনন্দ পায়। সূর্য বা চাঁদের স্বাভাবিকত্ব প্রমাণ করবার জন্য কোনো সাক্ষ্যের দরকার নেই। সত্য নদীর সুর হয়ে ওঠে না। স্রোতের সুরের নিচে একটি গীতবিতান থাকে। তার স্বরূপ চেনবার জন্য তৃষ্ণা ও সক্ষমতা জরুরি।

 

অর্কিড ও অন্তর্গত দৃশ্য

প্রেম ও মৃত্যুর মাঝে দাঁড়িয়ে আছি। ক্ষুদ্র জানালা দিয়ে দেখা যায় কেবল রোদদীপ্ত মেঘের মহড়া। সাদা মেঘের নিচে নীলের আলপনা তুলে আনে যমুনাকে। যমুনার মাঝে দাঁড়িয়ে মেঘের মধ্যে নদীর প্রতিভাস লক্ষ করিনি। মেঘের পাশে দাঁড়িয়ে নদীস্রোতে ভেসে যাই। আমি ভেসে যাই অদৃশ্য হাত ধরে। ভেসে গেলে মৃত্যুর কথা মনে আসে কেনো? ক্রাউন প্লাজার নির্জন কক্ষে বসে একা থাকতে পারিনি আজ সকালবেলা। বিশাল আয়নায় বিন্যস্ত অর্কিডের  মাঝে প্রতিফলিত ছিলো অন্তর্গত দৃশ্য। দৃশ্যের ভেতরে ঢুকে, থেকে থেকে দেখেছি সূর্য-বিনাশের ছবি। বাস্তবতার সংকেতময় ভূমিকায় বিস্মিত হয়ে পড়ি। যন্ত্রের সহযোগী হয়ে ভুলে যাই ফুলজোড় নদীর নাম; যন্ত্রশব্দে কান রুদ্ধ হয়ে এলে গভীরবর্ণ জারবেরা অক্ষয় দেয়ালে লিখে রাখে উজ্জ্বল হাহাকার।

 

শব্দজলের উষ্ণতা

অন্ধকার শূন্যতার ভেতর জেগে থাকে নিয়ন্ত্রিত গতির কম্পন। নিঃস্বর চেতনা মগ্নপাহাড়ের স্নিগ্ধতায় প্রসারিত হতে থাকে। চিরায়ু শব্দের অদৃশ্য বন্যায় আকাশ ডুবে যায়। শব্দজলের অবিকল্প উষ্ণতা নির্জন গৃহে ডেকে আনে মায়াঘোর। আমি অন্ধকারের ভেতর স্বর্ণাভ পদ্মের প্রস্ফুটন দেখি; এলোমেলো সুতোর ভেতর দীর্ঘতম জামদানি। দৃষ্টির অন্তর্গত রূপান্তর পুনরুদ্ধার করে অগভীর জল; রহস্যময় মাটিতে দাঁড়িয়ে দেখি জীবনের ক্রমাগত উৎক্ষেপণ ও রাডার-এরিয়েলের অক্লান্ত ঘূর্ণন।

 

মেঘের মেটামরফসিস

মেঘচূড়ায় সূর্যের শুভ্রতা পৃথিবীর একটি প্রান্তকে আলোড়িত করে তুলছে। গতিময় বাহন থেকে আমি আপাত তাপহীন দৃশ্যের ভেতর তোমার অস্তিত্ব অনুভব করছি। গোলকার্ধের বিশ্রান্ত পথে তুমি আচ্ছন্ন অতীতের করবীরসে রক্তিম করে তুলছো করতল। হাতের অবিনাশী আভা মেঘের বিচিত্র স্থাপত্যে ক্রমশ ছড়িয়ে দিচ্ছে গভীর প্রলেপ। মেঘের মেটামরফসিস অন্তর্গত তুলোর ভেতর রচনা করছে শ্রেষ্ঠ প্রহর। দীপ্ত সুতো থেকে ঝরে পড়ছে তরল গান্ধার। সাঙ্গীতিক তরলতা হাতের রং বিষয়ক অনুচিন্তনকে পৃথিবীর সমস্ত  উপাদান থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখছে। মেঘ আমাকে নির্জন করে রাখে।

 

বিন্দুর স্থিরতা

বিন্দুর স্থিরতা বিস্ময়কর। দুঃসহ বেগে ছুটতে ছুটতে বিন্দুর প্রচ্ছায়ায় প্রশান্ত হবার ভান করি। প্রতারণা সহজ কাজ নয়। আলেয়ার রূপকময় অন্ধকারে হাঁটবার শক্তি থাকতে হয়। এ শক্তি অর্জনের জন্য কি পায়ের মাংসপেশী ক্রমান্বয়ে অনুগত ও সক্ষম হয়ে উঠেছে? হীনতার কোনো শেষ নেই — আমার বোধের ভেতর এ বাক্য যখন ঘূর্ণাবর্ত হয়ে ওঠে তখন অবসাদগ্রস্ত পথিকের অচঞ্চল চোখের পাতায় মিশে থাকি। অচঞ্চল চোখের পাতা ও বিন্দুর স্থিরতা এক নয়। চঞ্চল চোখের ভেতর স্থির বিন্দুকে উদ্ভাসিত করবার জন্য দূর গ্রহের সঙ্গীতে প্রতি সন্ধ্যা মগ্ন থাকি। গ্রহের দূরত্ব ও শ্রুত সঙ্গীতের ব্যবধান মগ্নতার ভেতর কখনো সঞ্চার করে মধ্যপ্রাচ্য-বাতাস। আমি বাতাসের ভেতর দিয়ে বিন্দুর স্থিরতার দিকে নিষ্পলক চেয়ে থাকি।

 

পাহারার অগ্নিবন্ধন

দৃষ্টি নয়, পাহারার অগ্নিবন্ধন থেকে বেরিয়ে আসার জন্য উদগ্রীব থাকি। পথে গলিত আগুনের সর্পিল গতি। ব্যক্তিগত বিষাদ কিংবা স্পেসবন্দি আনন্দের ভেতর মাঝে মাঝেই ঢুকে পড়ে সাপ। নির্মোকে খোদিত থাকে সাপের নির্গমনকাল। সাপকে দেখা যায় না, সাপের অগ্নিময়, আকস্মিক শব্দে কেবল কেঁপে উঠি। স্নায়ুর ভেতর কম্পনসূত্র রেখে যায় মনোরোগের নটে বীজ; বীজের গোলাপি আভা আমার শক্তি ও অস্তিত্বকে উপহাস করে। আমি পরিবেশবন্ধন থেকে নিজের জন্য খুঁজি দূর কোনো গ্রহ।

 

জলঘুড়ি

এ বাতানুকূল কক্ষে রং ছড়িয়ে রাখে না আরব সাগরের ঝিনুক। তবুও সমস্ত শ্বাসযোগ্য বাতাসে ওড়ে ঝিনুকের জলঘুড়ি। ঘুড়ির আশ্চর্য উড়ালরেখা ভরে থাকে হিমচাঁপার আলো আর গন্ধে। চাও ফ্রাইয়ার বক্ষে টাল খেতে খেতে শেষ বেলা চলে যাবো কোনো এক ভিড়প্রবণ স্কাইট্রেন স্টেশনে। স্কাইট্রেনের সাথে পাল্লা দিয়ে উড়ে যাবে জলঘুড়ি — হিমচাঁপাকোমল উজ্জ্বলতায় জেগে থাকবে আমার জল-মৃত্তিকা-বাতাসহীন ব্যক্তিগত পথ।

 

কম্পন

কতোভাবেই তো প্রস্তুত হওয়া যায়! আমার প্রস্তুতিপথে মেঘ-নক্ষত্র-আকাশ ক্রোটনপত্র ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমার চোখে পাতার ত্রিমাত্রিক নৃত্য দেখে বলেছিলে কিছু কম্পন শাশ্বত হয়ে ওঠে। প্লেনের ক্ষণস্থায়ী কম্পন তোমার স্বরসত্তাকে প্রবল করে তুলছে। এবার শূন্যতা কুণ্ডলিত হলে তুমি আমার ক্ষয়িষ্ণু ত্বক আর পেশির ভেতর দেখবে যতিহীন শব্দের প্রসারতা। যন্ত্র আর বাতাস যে নিরবচ্ছিন্ন শব্দ তৈরি করে তার প্রভাব-সূত্র নিউরনে রেখে যায় অম্লান বিশ্বাস। পরিবর্তনের ভেতর যা অপরিবর্তিত থেকে যায় তাকে জেনেছি নৃত্য। ক্ষয়ের কেন্দ্রে যা অক্ষয় থেকে যায় তাকে জেনেছি কম্পন। আমি আসছি, তুমি আমার কম্পন দেখে নিয়ো।

 

ডায়মন্ড ব্লেড

ব্যথাতুর মৃণালে জেগে আছে স্নো-পদ্ম। ভাইবারে ভেসে ওঠা শুভ্র দ্রাঘিমা ক্রমশ উন্মোচন করে ইলেকট্রন-অঙ্কিত ত্রিভুজতত্ত্ব। বহির্ফ্ল্যাটে ডায়মন্ড ব্লেড কেটে চলে স্বপ্নবর্ণ টাইলস। ঝনঝনায়মান আকাশের শীর্ষে ওড়ে পদধ্বনিময় রুমাল। চেতন-অবচেতনকে কাক্সিক্ষত ব্লকে কেটে জন্মগন্ধময় মৃত্তিকায় খাড়া করবার চেষ্টায় থাকি নিয়োজিত। অনুচ্চ ভবনের পাশে পড়ে থাকে শুকনো, পচা, তাজা রক্ত। রক্তসাক্ষ্য স্বীকার করে না ম্লানতা; ধুলোকণায় রেখে যায় মিহি উজ্জ্বলতা, বাতাসে সতেজ স্নো-স্বপ্ন।

 

পাখিসত্তার ক্রন্দন

পাখিসত্তার ক্রন্দন নিয়ে জেগে থাকি। ওয়েস্টবেরির গৃহদৃশ্য থরথরিয়ে ওঠে, অনতিদূর পার্ক থেকে ভেসে আসে নিশ্বাসের উত্তাপ। বাস্তবতা দৃশ্যকে প্রসারিত করে; কিছু দৃশ্য অধিবিদ্যক অর্বিট রচনা করে — সেখানে পাখিসত্তা ঘুরে চলে, ডানাকেন্দ্রে কম্পন জাগিয়ে রাখে, গভীর চুমুকে তুলে নেয় অনিঃশেষ স্মুদি। তার চোখের ভেতর অর্থময় হতে থাকে রাত্রির কথকতা — আকস্মিকভাবে সে হয়ে পড়ে চেতানহীন। রাতশেফালি ফুটে ওঠে, রাতের উদ্ভাসন পাখিসত্তার দৃষ্টিতে রেখে যেতে পারে না কোনো গূঢ় প্রহর।

 

ভাষা, দৃশ্যের বিকৃত প্রচ্ছায়া

শুভ্র মেঘের ঊর্ধ্বগামী তরঙ্গে লেগে আছে ধূসর ছোপ। উজ্জ্বলতার অনির্ভর বিকাশ নেই। ধূসরতার শক্তি দৃশ্যকে পূর্ণ করে। বস্তুত দৃশ্যকে ভাষান্তরিত করা যায় না।  ভাষা, দৃশ্যের দূর  বিকৃত প্রচ্ছায়া। জীবনের উজ্জ্বল-ধূসর রহস্যের সত্য কোনো প্রতিরূপ নেই। নিরন্তর ব্যর্থ বর্ণে এঁকে যাই অতি ক্ষুদ্র আকাশ। আকাশকে চিনিয়ে রাখি প্রতীক বলে। আমাদের জীবনকে ঘিরে থাকে অজস্র দুর্বল আকাশ। আকাশগুলো আমাদের চরিত্রের স্মারক হয়ে ওঠে। আকাশে ভেসে ওঠে প্রেমের দুর্বোধ্য পারিজাত, হৃদয়ের বিপ্রতীপ পল্লব। ব্রহ্মাণ্ডের ধুলোকণার কাছে আকাশ মূল্যহীন; এ আকাশের জন্য আমাদের যুদ্ধ, বিজয়োল্লাস। আকাশের মনস্তাত্বিক ইতিহাসের মূল্য হয়তো এখনো নির্ধারণ করা যায়নি।

 

ঢিবি

মার পাশে বিক্ষত শিউলি দাঁড়িয়ে থাকতো এক বিষণ্ন প্রহরী; কলাপাতা সূর্যকরোজ্জ্বল দিনে নাড়– বানাতে বানাতে জাগিয়ে তুলতো মার শিউলি শ্বাসের প্রতিধ্বনি। জামছায়ায় নৃত্যপর ছিলো পুবের পদ্মপুকুর। জল শুকিয়ে গেলে পুকুরের করুণাময় মাটি দিয়ে সেরে তোলা হতো বর্ষাগ্রস্ত উঠোনের নালি ঘা। আমি বোনকে নিয়ে গড়ে তুলতাম মার জন্য অতুঙ্গ, মৃন্ময় ঢিবি। এভাবে মা, মাটি, ফুল ও বৃক্ষ আমাদের চেতনার সুগুপ্ত দ্বীপে রচনা করে শুভ্র সৌধ। ঢিবিময় বাড়ি ছেড়ে আমাদের পেরিয়ে যেতে হয় অগ্নিমান সীমানা; শরণার্থী দৃষ্টি বারংবার সিক্ত হয় মার শিউলি সৌরভে। শিউলি ও কলাগাছের কুলোচ্ছেদের চেয়ে মৃন্ময় ঢিবির অবলোপন আশঙ্কায় আমি থাকতাম উদ্ভ্রান্ত। বিধ্বস্ত স্বদেশে ফিরে দেখি প্রাণময় পুষ্প-পত্র-ঢিবি যুদ্ধস্রোতে গেছে ভেসে। পুরনো কাঁথার সেলাই কেটে মার শ্যামল শাড়ির কমনীয় টুকরো সযত্নে রেখেছিলাম তক্তপোষের উষ্ণ কন্দরে। লুটেরার নাপাক থাবায় আমাদের আসবাবপত্র চিরতরে হয়েছে দৃশ্যাতীত; এক খণ্ড ন্যাকড়াও পড়ে থাকেনি বাস্তুভিটায়। দেশের জন্য দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষের রক্তবীজাঙ্কুর ধারণ করি নিরাতঙ্ক জিহ্বায়। ছাত্রাবস্থায় ফুলপ্যান্টের ব্যয় মেটাতে মার নামাঙ্কিত সুবর্ণ-লকেট সেকরার হাতে তুলে দিয়ে নির্জনতাকে করেছি লোনাক্ত। মার স্পর্শদীপ্ত শেষ চিহ্ন হারিয়ে এখন উঠোনের দিকে চেয়ে থাকি; মা যেখানে শিউলি ফুলে ডুবে থাকতেন সেই পবিত্র বেদির কাছে আমিও ডুবে থাকি অদৃশ্য জলের উষ্ণ ধারায়। এ মাটিতে শুয়ে যেনো আমিও একদিন কলাপাতার সবুজ স্নেহে শীতল হয়ে উঠি।

 

আগুনের পলাশ মুদ্রা ও স্বদেশ

নৃশংস বুলেটের দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে আমরা সন্তর্পণে গ্রামের অন্ধকার পথে বেরিয়ে পড়ি। গরুর গাড়ির ছই ঢেকে রাখে গ্রামের স্বপ্নোজ্জ্বল শেষ প্রদীপের শিহরণ। আমার ভয়ার্ত চোখের গভীরে ভেসে ওঠে মৃত্তিঙ্গা গ্রামের গৃহদাহ-বিভীষিকা: টিন-কাঠ-বাঁশ-খড়ের বাড়িগুলো শুধু নয়, আম-কাঁঠাল-নিম-নিসিন্দার মতো স্থানু বন্ধুরাও অগ্নি-কুণ্ডলে বন্দি — বাস্তুভিটার ভস্ম ফুঁড়ে জেগে ওঠা টেরাকোটাবর্ণ মৃৎচুলা দেখে চিনে নেয়া যায় রান্নাঘরের অবস্থান। আগুনের পলাশ মুদ্রায় কিছু সুউচ্চ সুপারি বিক্ষত, বিবর্ণ। পশ্চিমাকাশে রক্তজবা বিকিরণে উৎকণ্ঠিত সত্তা কাঁকরগাড়ি বিলের সান্ধ্য নির্জনতায় বিমূঢ়, স্তব্ধ।

নদী পেরিয়ে আমাদের যেতে হবে শুশ্রষাময় সীমান্তে। নৌকোর নিশ্চিন্ত অন্ধকারে ঢেকে উদ্বাস্তুসেবক আমাদের নিয়ে যায় অবারিত ঘাটে। চলৎশক্তিহীন, ন্যুব্জ সহযাত্রীর বিপন্নতা বুকে বিঁধিয়ে দেয় সুতীব্র তীর। শরণার্থীশিবিরে আশ্রিত না হওয়া অব্দি অগণিত মানুষ সীমান্তের উন্মুক্ত হেঁসেলে চাল ফুটিয়ে খায়, গো-মোষ সাথে নিয়ে অসংবৃত রাত কাটায়।

রাজবাড়ি ক্যাম্পে তাঁবুবাসী হয়ে বাবা আর্ত জনতার পাশে দাঁড়ান আর আমরা গ্রাম্য বাড়ির স্যাঁতসেঁতে উঠোনে নির্মিত একচালায় সংকুচিত হয়ে থাকি। ধানক্ষেত, পাটক্ষেতের আল ধরে আমি বিলের জলে খলসে মাছের উজ্জ্বল ডুবসাঁতার দেখি, খয়ের বনে হরিয়ালের প্রসন্ন উড়ালে বিমোহিত হই আর ভাবি, জীবন হয়তো থেকে যাবে আলোশূন্য অন্ধকারে। বাবা, জীবন বাজি রেখে যুদ্ধের ভেতর যখন স্বভূমির গন্ধ আর জরুরি খবর নেবার জন্য নিরুদ্দেশ হতেন তখন আমাদের কাটতো বিমর্ষকাল।

আমরা রেশনের চাল-ডাল-তেল-লাকড়ি নেবার জন্য পাকা রাস্তার পাশে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম আর ট্রাক-ভর্তি মিত্রসেনা ও মুক্তিফৌজের দৃপ্ত মুখাবয়ব লক্ষ করে বিশ্বাস করতাম অচিরেই অন্ধকার যাবে কেটে।

আমরা ফিরে আসবো বলে আমাদের পুকুর ভরে ওঠে শিং আর মাগুরে; উঠোন ছেয়ে যায় শিমের সবুজ মমতায়। আমরা যেদিন ফিরে আসি ‘পাকড়া’ বাবার পায়ে পড়ে অনেকক্ষণ হাউহাউ করে কেঁদেছিল। আমাদের পোষা কুকুর ‘পাকড়া’ বাস্তুভিটায় আগাছার অনভিপ্রেত রাজত্ব দেখেও হয়তো হতাশ হয়নি। স্বদেশে পোষা কুকুরের হৃদয়ের মহত্ত্ব দিয়ে আমাদের আর কেউ স্বাগত জানায়নি।

 

জীবন-প্লাবিতার কথকতা

বুকের মধ্যে অদৃশ্য যে জলধারা, নিয়ত কল্লোলিত, তার চিরচেনা নাম জীবন। জলের উদ্বেল প্লাবিতা রচনা করে সুবেদী সরোবর। দুর্লভ নীলপদ্ম আর জলজ লতা-পাতা উন্মোচন করে গহন দৃষ্টির শিশির-রশ্মির কথকতা।

আমার জীবন ও মৃত্যুচেতনার সাথে এক পরম, অব্যাখ্যেয় আবেগ নিশ্বাসের সহচর। আমি তাকে লালন করি সত্তার সুনির্মল খোলে। আমার চেতন ও অবচেতন-চক্রে সংলিপ্ত মঞ্জরির বিভাস আমাকে অহর্নিশ আচ্ছন্ন করে রাখে।

সংবেদনশীল জীবন করণকৌশলগত নয়; প্রযুক্তির স্পর্শে সে ফিরে যেতে পারে না আরম্ভ-বিন্দুতে। জীবনের তুলনা নদী, সে কখনো ফেরে না; যেতে যেতে মিশে যায় কিংবা নিশ্চিহ্ন হয়। যদি তাকে ফিরতেই হয় তবে সে তার পথ ও অবয়ব বদলিয়ে ফেলে। তখন সে নদী নয়, নির্বেগ খাত। মানবিক বৃত্তির সৎকার ছাড়া প্রকৃত জীবন ফিরে যেতে পারে না।

সংবেদনা-বিভাসিত মূল্যবোধ সুগভীর ও অস্তিত্বস্পর্শী। পলাশঋতুর অন্তর্দেশে তা সেঁধিয়ে দেয় ক্ষরণজ্বালা। মুহূর্তগুলো তখন পুড়তে থাকে। দহন নিশ্চিত করে অনাগত অনুপলের স্ফুটন। দহন শেষে ফসলের মাঠ উদার ভস্মে জেগে ওঠে।

জীবনে প্রত্যাশা ও অগ্নির অমোঘতা প্রমাণীকৃত। যা চাই না তাও মাঝে মাঝে চাই। জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠলেও জীবন থেকে অবলীলায় মুক্তি নেয়া যায় না।

যে প্রতীক আশ্রয়ের অধিক তা জীবনের জন্য জরুরি। প্রতীকহীনতা জীবনহীনতার নামান্তর। প্রথাবিরোধী চিত্তও চায় বন্ধন — অনারোপিত, অন্তরপ্লাবী। অনুক্ষণ চিন্তাপ্রবাহ যে শতদল ফুটিয়ে রাখে তার বর্ণ, সুবাস ও স্পর্শ জীবসত্তায় যোগ করে শিহরিত, অমেয় জীবন। জীবন স্বপ্নময়তার মৃণাল। অনুরাগ সত্য হলে গহন জীবন-স্রোতের কলধ্বনি শ্রবণ দোষাবহ নয় জেনে আমি জীবন-দৃশ্য-ধ্বনির কাছে নতজানু হয়ে থাকি।

জীবনের পরিণত রং ধূসর। ধূসরতা কোথাও স্পষ্ট, দ্রুত কোথাও অস্পষ্ট, বিলম্বিত। অনিশ্চয়তা ও অশ্রুময়তা জীবনের করুণ লক্ষণ। মুহূর্তেই কম্পন-কল্পনা কাঠের গুঁড়োর সহগামী হয়ে ভাসতে পারে মেঘ-শীতল বাতাসে। চির অপেক্ষমাণ ক্রন্দন মানুষের শেষ সঙ্গী। হয়তো জীবন কোনোভাবে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। অপ্রাপ্তির পেয়ালা পূর্ণ হয় উষ্ণ অশ্রুর অমল ধারায়।

শূন্যতাবোধ জীবনকে জটিল করে তোলে। শূন্যতার সর্বগ্রাহ্য সরলার্থ নেই বলে যন্ত্রণার যথার্থ স্বরূপ উন্মোচন একান্তই দুঃসাধ্য।

জীবন তাহলে অর্থহীন দীর্ঘবাক্য? কখনো ভাবি মুছে ফেলি দু-একটি শব্দ কিংবা সম্পূর্ণ পঙক্তি। কখনো ভাবি অর্থহীনতারও বুঝি রয়েছে অর্থ যা আমি জানি না। মানুষ সব কিছু জেনে যেতে পারে না।

 

রাত ও সবুজ দৃষ্টির উড়াল

উজ্জ্বল দিনের শেষে যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, লজ্জাবতী পাতা যখন নুয়ে পড়ে, তখন আমি অনিবার্য অস্পষ্টতার মধ্যে একটি সবুজ দৃষ্টির উড়াল অনুভব করি।

সন্ধ্যায় সকল বৃক্ষ ক্রন্দন করে। ক্রন্দন-ধ্বনি ভেসে আসে শব্দহীন ঝরনার সাম্পানে। প্রান্তরে প্রান্তরে ঝরনার প্লাবন ঝরে পড়ে। বুকপকেটে জমাতে থাকি প্রাত্যহিক বন্যার প্রতিচ্ছবি। আমার স্থির বিশ্বাস পৃথিবী প্লাবনময়।

সূর্য অস্তমিত হলে অন্ধকারের প্রতীক্ষা সত্য বলে প্রতীয়মান হয়। রাতের অর্থ কি শুধুই অন্ধকার? চিরায়ু আলোর অধিরাজ্যে অন্ধকার কি অনাদ্য? আলোর তৃষ্ণার তসর অন্ধকারে বিছিয়ে রাখে কি প্রতীক্ষার প্রহর?

আমি তুলে রাখি সান্ধ্য প্রকৃতির কিছু ছবি — জীবনের ম্লানতায় ছোপানো বেদনাবিভাব। সন্ধ্যার বিষণ্ন আকাশ, ধূসর বৃক্ষ-লতার দিকে চেয়ে অনিবার্য নিরালোকে নিমজ্জিত হয়ে পড়ি। মাটি আর পাথরের তলদেশ হতে ভেসে আসে সবুজাভ আর্তধ্বনি। অপস্রিয়মাণ আলোকের গন্ধে ভরে থাকে অনিশ্চিত জীবন। কোন এক সন্ধ্যা হবে আমার শেষ আশ্রয়!

তমসা-নিমগ্ন বৃক্ষের দিকে চেয়ে গভীর অন্ধকারের স্বরূপ উপলব্ধি করি; এ অন্ধকারে আলোর অধিকার নেই। নির্ঘুম রাতের নিরালোক কুয়াশায় শুনি বিষণ্ন তুষারের বৃন্দধ্বনি।

রাতের সাথে রয়েছে হৃদয়ের যোগ। শ্রেয় সত্তার গহন আঙুল নিস্তব্ধ রাত্রির অশ্রুত সঙ্গীতে নেচে ওঠে। রাতের নির্যাস নিয়ে নীল যে কুসুম ফোটে তাকে কোমল থালায় সাজিয়ে রাখি। পরিপক্ক অন্ধকারের ভেতর থেকে ফুটে ওঠে আলো; আপাত দুর্বোধ্য, প্রগাঢ় প্রার্থনার ভেতর থেকে জেগে ওঠে পুষ্প-অমৃত।

রাতের বিষণ্ন কম্পন-গভীরতায় চাই নিঃসাড় নির্বাসন।

 

পারমিতার প্রত্যুক্তি

আপনি আবির্ভূত হয়েছিলেন বিদ্যুতের গতি ও স্পর্শ নিয়ে। আপনার প্রকৃতি ও চেতনার সাথে আমার স্বভাবের কোনো সাযুজ্য নেই জেনেও বিপন্ন জলায় আপনি ফেলেছেন অচ্ছেদ্য জাল। আমার বিধুর অস্তিত্ব আপনার সুবেদী সত্তায় সন্তাপী ছায়া ফেলে কি? অশান্ত সাগরতীরে পড়ে আছি নিষ্প্রাণ শঙ্খ। তরঙ্গ-তীব্রতার স্মৃতি ও সূক্ষ্ম করাতের দহন আমার অবিনাশী সঞ্চয়। সাগর-সৈকত-মানুষের কাছে কোনো দিন প্রার্থনা করিনি; অধিকারের সুবোধ্য সূত্ররাজি কখনো করিনি উচ্চারণ। অদৃশ্য সঞ্চয় নিয়ে আমার শুধু মৃত্যুময় বেঁচে থাকা! যে পথে না চললেও আমার দিন কেটে যেতো সে পথ মেলে ধরেছে অভিনব অভিজ্ঞতার অভিজ্ঞান। অভিজ্ঞতার অগ্নি জ্বালিয়ে দিয়েছে আমার শয্যাগৃহ। আমি রাত্রির অদ্ভুত নির্জনতায় বসে পাঠ করি দৃশ্যময়, অন্তঃশীল পঙ্ক্তিমালা; বিষণ্ন বসনপ্রান্তে তুলে রাখি লোনা শিশির। আপনি আমার কম্পিত পার্থিবতার মনোগ্রাফ হাতে তুলে নেবেন কি?

 

আত্মবিভক্তি

উজ্জ্বল হরিণীর পেছনে ছুটতে ছুটতে নিজেকে বিভক্ত করে ফেলি। আমার বিচ্ছিন্ন সত্তার স্নায়ুতে জমে জীবনান্তক বিষ। আমি বয়োবৃদ্ধ এন্তাজ ওঝার গ্রাম্য শুশ্রষাগারে ছুটে যাই। আমার জর্জরিত শরীর থেকে এক মুঠো ঢেঁকিপাতায় তিনি তুলে আনেন স্নায়ুবিষ। গাঢ় সবুজ ঢেঁকিপাতা ছাইবর্ণ হয়ে ওঠে। গভীর রাতে কখনো কখনো আমি অদ্বিতীয় হয়ে উঠি। আমার অন্তরিন্দ্রিয় থেকে তখন ঝরতে থাকে সৌরকিরণ; বস্তুরাশির খোলস ভেদ করে তা স্বরূপের সারল্য ঝলকিত করে তোলে। বিবর্ণ ঢেঁকিপাতা আর প্রতারণার দহন মুহূর্তে সমার্থক পদে উন্নীত হয়।

 

 বৃষ্টির আলোকময় পাখা

যেতে চাই না, তবুও যাই। অন্ধকারে বনের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকি। অন্ধকারে বৃষ্টি নামে — এ সংস্কার বোধের ভেতর বদ্ধমূল। বৃষ্টির উড়াল দেখবো বলে অন্ধকারে ঊর্ধ্বমুখী হই। বৃষ্টির আলোকময় পাখা আকাশে ভেসে আসে না যখনতখন। আমি বৃষ্টির আবির্ভাবের জন্য প্রতীক্ষা করতে থাকি। আমার বোধাশ্রয়ী শেকড় সমভূমির পলিস্বাদে আচ্ছন্ন হয়।

প্রতীক্ষা জীবসত্তার আমূল পরিবর্তন ঘটায়। আমি রূপান্তরিত হই বৃক্ষে। আমার আপাত নিশ্চল শাখায় বসে রাত্রিচর পাখিরা ভাঁজে মগ্নতার প্রার্থনাসুর। ঊর্ধ্বগামী বায়ু ও মেঘের কাছে ময়ূরকণ্ঠী খামে আমরা পাঠাই মন্দ্রিত সুরের শিহরণ। কেননা, সময়ের শিল্পময় প্রসারণের জন্য বৃষ্টির প্রয়োজন।

 

অসম মেঘসীমার ওপর

অসম মেঘসীমার ওপর দিয়ে ছুটে চলি এবং সমস্ত চেতনায় ধারণ করি শঙ্কা ও শিহরন। আঁকাবাঁকা রেখার অনেক নিচে পড়ে থাকে নদীর নিথর শরীর। নদীর প্রার্থনা ভেসে আসে গাঢ় নীল শূন্যতার অসীমতায়। এখানে দিগন্ত জুড়ে মেঘের ভাসমানতা। আলোকিত শুভ্র মেঘের ফাঁকে ফাঁকে জেগে ওঠে ক্রন্দিত মুখ। সূর্য উজ্জ্বল করে রাখে ভূ-পৃষ্ঠের সজীব মানচিত্র। নামহীন নদী, অরণ্য কিংবা ভূ-অঞ্চলের চপলতা ক্ষীয়মাণ মনে হয়। ভূ-খণ্ডের কোথায় ধান, কোথায় গম উৎপাদিত হয় তা দৃশ্যমান নয়। ধাবমান গৃহে ভাত আর জলের সুলভতা আমাকে বিহ্বল করে। আমি আলোর উৎস মহাশূন্যের দিকে তাকাই; অত:পর ভাতের উৎস ভূ-মণ্ডলের দিকে দৃষ্টিপাত করি। অদৃশ্য কৃষকের ক্রন্দন আর্দ্রতর করে শূন্যতার নীলিম বক্ষ। মহাশূন্যে স্পষ্ট হয়ে পড়ে জীবন ও শূন্যতার সম্পর্ক। শূন্যতাও ফিরে যেতে চায় জীবনের কাছে। শূন্যতা জীবন ছাড়া পূর্ণ হয় না। মেঘ গড়িয়ে পড়ে বৃক্ষপত্রে, অসীম নীলতা মিশে যায় সাগরের জলে। শূন্যতাকে অর্থময় করা হলে শস্যদানা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

 

স্রোতফেনাময়তা

ঝলসিত সিয়েনার রঙে ছোপানো জাগ্রত জীবন বিষণ্নতার শস্যভূমি। নিশ্চুপ থাকি, অনন্ত স্রোতোফেনা উজানপথে ফিরে মহাকালের অদৃশ্য গৃহে আশ্রয় খোঁজে। আমি সমস্ত জানালা খুলে ম্লান আকাশের দিকে  চেয়ে থাকি। ধূসর পাখির গান অরণ্যের সবুজ আভায় মেশাতে থাকে বেপথু জলের প্রস্রবণ। আমার আকুল কণ্ঠে উচ্চারিত হয় গান থামাবার গূঢ় শব্দাবলি; মুহূর্তে পাখি অদৃশ্য হয়ে যায়। দিগন্ত জুড়ে বিস্তৃত যে অরণ্য মগ্নতার তরঙ্গ বইয়ে দেয়   তা-ও নিমেষে হয়ে পড়ে দৃশ্যাতীত। সজোরে কে যেনো বন্ধ করে রাখে আমার সকল জানালা। আমি আপন অন্ধকারে বসে সমুজ্জ্বল স্ফটিকের উষ্ণতা নিতে থাকি।

 

জলকথা

কিছু জল কখনো শুকোয় না।  কিছু কথা কখনো হয় না অস্পষ্ট। একটি বা দুটি মৃত্যুর সাথে হয়তো সেগুলোর অবসান ঘটে। জল, কথা কিংবা দৃশ্য জীবনকে দুর্বহ করে তোলে। জলসূত্র শাশ্বত বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের পরিপন্থী হলে তা নিয়ে আলোচনা করা যায় না। যে কথা আমি শুনি, আত্মজন শোনে না, তা নিয়ে নিশ্চুপ থাকতে হয়। যে দৃশ্য আমি দেখি, কেউ চাক্ষুষ করে না, তা নিয়ে মুখর হওয়া যায় না। ব্যক্তিগত জলে যখন জলোচ্ছ্বাস ঘটে তখন ত্রাণ অকার্যকর হয়ে পড়ে। অবিনাশী কথা যখন বজ্রের শক্তি ধারণ করে তখন পৃথিবীতে কোনো নিঃশব্দ গুহার অস্তিত্ব থাকে না। দৃশ্যপট যখন উত্তাল তরঙ্গে ভেসে যেতে থাকে তখন রাতের প্রভাব থেকে নিদ্রা মুক্ত হয়ে ওঠে। গহন জীবন ক্রমাগত বাহিত হয় অনির্দেশ্য ভবিষ্যতের দিকে।

 

অভিবাসী জল

শারদ বৃষ্টির শব্দের ভেতর ডুবে থাকি। মাধবকুণ্ড বনের ভেজা বাতাসের সাথে আমি গন্ধহীন গোলাপের দেশে ফিরে যাই। যে ওকদৃশ্য উদ্বাস্তু আলোককে দৃশ্যান্তরে নিয়ে যায় আমি তার রহস্যময় শক্তির ঘ্রাণ খুঁজি। স্তব্ধ ওকবন যখন কাঠবেড়ালিকে চঞ্চল করে তোলে, পরিতাপময় অসংখ্য সুতো থেকে ঝরে পড়ে মিরপুরের মগ্ন জল। শীতল পাথরপথ জলের ছায়ায় জেগে ওঠে, চিরঞ্জীব সেলোফেনে সাজিয়ে রাখে বিষণ্ন চিহ্নধারা। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, তুষারের চতুরঙ্গ ভেদ করে লক্ষ্যকামী পথিকের দল অহর্নিশি ছুটে চলে। শুধু পদ্মপ্রাণ পথিকের দৃষ্টি ও করোটিতে ভেসে ওঠে জলপ্রতীকের মর্মশরীর।

 

 শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ

শূন্যতা কেবিন ক্রুর কৃত্রিম উজ্জ্বলতায় কেঁপে ওঠে। আমার কম্পিত দৃষ্টি বিরামপুরের স্ফীত পথে প্রসারিত হলে তুমি মুহূর্তেই চিনের বসন্ত ফুলের উচ্ছলতা নিয়ে আবির্ভূত হও। আমরা বাতাসে অঙ্গীকার, প্রতারণা ও ভবিতব্যমূলক সাংকেতিক পালক ছড়াতে থাকি। প্রার্থনা আমাদের সংবেদনা থেকে আলো ঝরাতে থাকে। পরিপার্শ্ব দুর্লভ পালকের বিচলনে প্রতপ্ত হয়ে ওঠে এবং নদীর উন্মন ধ্বনি অদৃশ্য ময়ূর পাখার ভেতর ঢুকে যেতে থাকে। প্রতারণাদগ্ধ মেঘের হাহাকার আমাদের অগভীর চুলে দুর্বহ কোরাসের প্রতিধ্বনি তোলে। ইথারাশ্রিত অঙ্গীকার বার্ডস নেস্ট সন্নিহিত বৃক্ষখুঁটির অসম্ভব সামর্থ দিয়ে আমাদের দাঁড় করিয়ে রাখে। আমরা মহাপ্রাচীরের ওপর দিয়ে ভবিতব্যের অস্পষ্ট বাতিঘরের দিকে তাকিয়ে থাকি। দ্রুতগতি ঘোড়ার জিনে চেপে আমরা ছ-হাজার মাইল পরিভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি। খর্বাকৃতি প্রহরীর অগ্নিময় কুঠার আর বল্লমে আমাদের ঘ্রাণময় সত্তা ঝলসে উঠতে থাকে। আমরা পাহাড়ের বসন্তের ভেতর, উপত্যকার শীতল হাওয়ার ভেতর হারিয়ে যেতে যেতে রোদের শুশ্রষা গ্রহণ করি। অনন্তর দুর্বোধ্য সুড়ঙ্গপথে এগিয়ে আমরা শিশুদের হাতে আলোকময় ভূগোল তুলে দেই আর অনন্ত অন্ধকারে অন্তর্লীন বাতাস বিসর্জনে প্রস্তুতি নিতে থাকি।

 

শূন্যতা ও সাইডউইন্ডার

শূন্যতার মধ্যে মূর্ত হয় মরুর স্বরূপতা। বাতাসে আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে স্পর্শেন্দ্রিয়ের প্রতিক্রিয়া জানবার জন্য চলে প্রকৃতির বিশেষ আয়োজন। ক্রমাগত গতিশীল হতে থাকে বালুর রুপালি ও কৃষ্ণ কণা — তারা নির্বৃক্ষ প্রান্তরে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত মেডুজার করাল চুলের অবগুন্ঠন রচনা করে। বিপদসংকুল বালিয়াড়ির আস্তরণ ভেঙে হঠাৎ ছুটে আসে  সাইডউইন্ডার — তার অতৃপ্ত জিভের তমসায় বন্দি হয় মরুর মালশ্রী। নিরালোক শূন্যতা চিতানলে সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

 

মেঘের প্রাচীর ও নৈঃশব্দ্যের বাদামি ফুল

বাতাস থেমে যাবার পর নেমে আসে অনন্ত জলধারা। সীমান্তে জলের বেদনা গড়ে তোলে বজ্রহীন মেঘের প্রাচীর। নৈঃশব্দ্যের বাদামি ফুলে ভরে থাকে প্রাচীরের আলোছায়া। ফুলের সংকেতগভীর গন্ধে মত্ত বাউল পেরিয়ে যেতে চায় জলময় দেয়াল। জলের চুম্বকে যোজিত হয় চাঁদবরন খঞ্জরি। মুহূর্তে বিষণ্ন প্রাচীর ব্রাত্য গমকের সোনালু ঝরনায় বিভাসিত হয়ে ওঠে। প্রাচীরের ওপারে পরিযায়ী ওমে আচ্ছন্ন থাকে কি সহৃদয় আকাশ? সেখানে সোনালি ঘুড়ির গানে চঞ্চল হয়ে ওঠে বিকেলের মেঘ? বাতাস থেমে যাবার পর নেমে আসে শুধু অনন্ত জলধারা।

 

নৈঃশব্দ্যে সবুজ ঘুঘু

অনাগত দৃশ্যের ভেতর সবুজ ঘুঘু নৈঃশব্দ্যের দিব্যরথে ঘাসের ছায়ানিবিড় খোপরে ফিরে আসে। পালক থেকে তার ঝরে পড়ে ঘুমন্ত শব্দবীজ। মগ্ন ঘুঘু নিদ্রাকালের প্রসার পরিমাপ করে এবং চোখে মাখে শব্দের খোয়াবশিশির। দূর অরণ্যের মাদল হাওয়া ভেসে এলে শব্দের খোলস ভাঙতে থাকে; অলৌকিক শিসে উদ্দাম হয়ে ওঠে মুথোদের উদ্বাহু শরীর। উৎসবরেখা ধরে অরণ্যে ফিরে যায় সমুজ্জ্বল, সবুজ ঘুঘু।

 

আকাশ ও বেদনার হরফ

বেরিয়ে আসার জন্য প্রযত্নে প্রয়োজন। ইচ্ছে হলেই আকাশ দেখা যায় না। পেরোবার পথ থাকে না মসৃণ। কাঁটাগাছে পূর্ণ থাকে পথের দু-ধার। পথের বন্ধুরতা ও কাঁটাগাছের অস্তিত্বের মধ্যে রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। অজ্ঞাত পরিকল্পনার প্রভাময় সঙ্কেতে প্রণীত হয় যাত্রা-সম্ভাব্যতার সূত্র। পা বাড়ালেই রক্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে কাঁটার জ্যোৎস্নাময় বিষ। আকাশ না দেখলে ক্ষতি নেই। আকাশ সকলের জন্য দর্শনীয় নয়। বৃত্তকে টুকরো করে, পাথুরে দেয়ালকে ভেঙে ফেলে আকাশ দেখার মধ্যে উত্তেজনা ও আনন্দ রয়েছে। আনন্দ যখন উপভোগ্য হয়ে ওঠে তখন বিভোরতা গভীরতর হয়। কণ্ঠের বদলে দৃষ্টি রূপান্তরিত হয় ভাষা ও বেদনার গোপীযন্ত্রে। অব্যক্ত ভাষা ও বেদনার বিভাসিত হরফ আকাশ থেকে নেমে আসে। আকাশকে কেউ কেউ উপেক্ষা করতে পারে না। জ্যোতির্বিদ্যাময় আকাশের জ্ঞান সাধারণ নয়, ব্যক্তিগত। আকাশ উন্মোচন করে দর্শকের প্রয়াস ও প্রাপ্তির দূরতা এবং জীবনের অপ্রচারিত সত্য।

 

প্রকৃত কোনো শব্দ

একটি শব্দের জন্য প্রান্তর বা রাস্তার নির্জনতায় নেমে পড়ি। পরিবাহী ইথারে ভাসতে থাকে দুর্বহ ঝরনাক্রন্দন। টিলাভূমির নিরাকার স্বত্বলিপি বাঁশের হুকোয় আর্তনাদ করে ওঠে। লতাগুল্মের অপার স্নেহে থেমে যায় নৃতাত্ত্বিক বিলাপ; নিভৃত জীবনপ্রকল্প পর্বতবৃক্ষের ছায়ায় শ্বেতকমলের স্বপ্নে নিদ্রাতুর পড়ে থাকে। অলক্ষ্য অশ্রুজল নিয়ত পূর্ণ করে উত্তরমেঘের আদিম কলস। পৃথিবীতে ক্রন্দনের চেয়ে প্রকৃত কোনো শব্দ নেই, প্রকৃত কোনো ভাষা নেই।

 

হুইসেল-কর্কের অনির্দেশ্য ঘূর্ণন

বর্গক্ষেত্রের ঊর্ধ্ব-অধোভাগ, ডান-বাম পার্শ্বস্থল এবং চার কর্ণের ক্রমবর্ধমান জ্যামিতিক প্রতিবেশে হুইসেল-কর্কের অনির্দেশ্য ঘূর্ণনের ভেতর জেগে থাকি। বিস্ময়কর বাতাস থেমে গেলে অথবা কর্ক বিনষ্ট হলে হুইসেল অকার্যকর হয়ে পড়ে। কর্কের ঘূর্ণনের সাথে যে সুর উত্থিত হয় তার ধ্রুপদায়ন দুঃসাধ্য জেনেও আমি সময়ের সোনালি দানা ছিটিয়ে দিই। কিন্তু কর্কের বস্তুশক্তি কিংবা হুইসেলের যৌগ মিশ্রণ এবং বায়ুপ্রবাহগত ক্রটির জন্য আমার প্রয়াস সার্থক হয় না।

 

বৃক্ষ ও সাগরস্বপ্ন

মহত্তম বৃক্ষের ছায়ায় কাটে আমার নির্জনতম কাল। কমলা বল্কলের প্রান্ত থেকে যখন ঝরে বেগুনি রশ্মি তখন উদ্ভাসিত ধুলোয় দাঁড়িয়ে আমি কাঁপতে থাকি। অদূর পথ, আলচিহ্নিত ক্ষেত, হোগলাকীর্ণ জলাশয় বার্তাবহ হয়ে ওঠে। বৃক্ষপত্রের প্রতারণাশূন্য শিহরণ পানডুবির বক্ষে জাগায় ব্রহ্মপুত্রের স্বচ্ছতম ঢেউ। জলের ভেতর ভিন্ন জলধারায় যে বৃক্ষছায়া মিশে থাকে নিরন্তর শোনে সে সাগরের অজর ধ্বনি। আমি বৃক্ষের নিচে মুদ্রিত চোখের গভীরে ধারণ করি শুদ্ধতম সাগরস্বপ্ন।

 

আনডিনের আঙুল

মৃত্যুকে যে অস্তিত্ব ডিঙিয়ে যায় তার নীলাভ তরঙ্গে ডুবে থাকি। তরঙ্গে ভেসে আসে যাত্রাকালের সংকটভাবনা, অনিদ্র প্রহর, রবীন্দ্র প্রশ্রয় ও আকুল ধ্বনির অনন্ততা। আমি এদের আঁকড়ে ধরি, অজলচর বলে থেকে থেকে নাসারন্ধ্রে টেনে নিই ধুলো — সিসার ঢাকাই চূর্ণ। আমার অদৃশ্য কম্পনের ভেতর ফুটতে থাকে নিশিপদ্ম — তার অশান্ত কেন্দ্রে জমে ভাঙনফেনার ঘোলাটে নির্যাস। তরঙ্গের চন্দ্রকোষে জেগে ওঠে আনডিনের উজ্জ্বল আঙুল — তার পদ্মকোষ মুদ্রা নিশ্চিত করে জলকুসুমের পুনর্বাসন।

 

দৃশ্যের পেছনে দৃশ্য

টারকোইজ-উচ্ছলিত বৃক্ষ, সোমত্ত তরঙ্গে উদ্বেলিত বসফোরাস, ফ্রে পর্বতে আনত প্রভাত আকাশ, ম্যাগপাই মুখরিত দুর্গম ট্রেইল — এই সমস্ত দৃশ্যের পেছনে আরো দৃশ্য থেকে যায়। আমি অবস্তুগত দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে যুগপৎ আনন্দিত ও বিষণ্ন হয়ে পড়ি। অস্তিত্বকে পুনর্জাগরিত করে এমন অতীত দৃশ্য অবলোকন বিমুগ্ধতার, কাম্য দৃশ্যের পুনর্মঞ্চায়ন সংক্রান্ত সংশয় বিষণ্নতার। তবে দৃশ্যময়তা নিরবচ্ছিন্ন আনন্দের উৎস হতে পারে না। আনন্দের জন্য প্রয়োজন প্রতারণাশূন্য নিমজ্জন। বিষণ্নতা প্রায়শ নির্মূল-অযোগ্য — এর সূক্ষ্ম শেকড় সকল দৃশ্যের মধ্যে সঞ্চারিত।

 

শ্যামল অন্তর্গৃহ

বিকেলের সূর্য যখন নির্মল ধানক্ষেতে নেমে আসে, হলুদের হিন্দোলিত জমিন পেরিয়ে অন্তরবৃতা তোমার বাড়ি যাবো। বনবিভাগ ক্যালিপটাসে ঢেকে দিয়েছে পথের দৃষ্টি; আমি ছায়াচ্ছন্ন পথে যেতে যেতে ডোবার দগ্ধ সিয়েনারং জলে দেখে নেবো কচু আর কলাপাতার জোড় বিধুনন।

পা-পাখার সারঙ্গিসুরে মত্ত ফড়িং-এর প্রতীক্ষায় ধঞ্চে গাছে বসে থাকবে ফিঙে, কখনো সে কলাগাছের ওপর দিয়ে উড়ে যাবে সোনালি পট্টে মোড়া বাঁশকরুলের ডগায়। সূর্য স্কারলেট-প্লেটে রূপান্তরিত হলে হাঁসেরা শেষবার ধুয়ে নেবে গলা; সুপুরিবাগান ক্রমে গাঢ়তর হলে তোমার দরজায় আমি করবো উতল করাঘাত। অবাক তুমি ডেকে নেবে নিভৃত গ্রহের শ্যামল অন্তর্গৃহে।

 

অন্ধকার ও স্বপ্নহীন বাতাসের ফ্লেয়ার্ড বেল

অন্ধকারে দূরবর্তী বাতি আর আধা-কালো আকাশের নক্ষত্র ছাড়া দ্রষ্টব্য কিছু নেই। নিরালোক গ্রামের পথে যখন হাঁটি বৃক্ষ-লতা-ডোবার গন্ধে ভেসে আসে অতীত; দৃশ্যমান ক্রেভ্যাসের মুখে রূপালি মই জুড়ে অতীত নিয়ে যায় হিম ভবিষ্যতে। দহনঅভিজ্ঞতা থেকে ধারণা জন্মেছিল, জীবন রক্তাক্ত বা রক্তপাতহীন আঘাতের সহজ শিকার। গন্দমঋতুর রূপমাধুর্য দেখে বুঝেছি জীবন একমাত্র বেদনার শস্যক্ষেত্র নয়। অভূতপূর্ব প্রাপ্তি মুছে দিতে পারে শুকনো ক্ষতের পাংশু মোহর। সিদ্ধিকুম্ভ ক্ষয়িত প্রত্নশানের সন্তাপে হতে পারে শিহরিত; তবে অন্তর্গূঢ় অস্তিত্ব থেকে নিঃসারিত হয় নিষ্ফলতার বোধ। অন্ধকারে মাটির হিমপ্রবণতা বৃদ্ধি পায় এবং চূর্ণিত শিলার ভেতর সংকেতময় হয়ে ওঠে স্বপ্নহীন বাতাসের ফ্লেয়ার্ড বেল।

 

আধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়াশরীর

আধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়াশরীর জিইয়ে রাখে আগুন ও অঙ্গার। টুকরো ম্যাকেট হতে উবে যায় যৌবনঘাম। প্রমগ্ন স্থাপত্য থেকে খসে পড়ে বিষণ্ন ব্যালাসট্রেড। আমি অগ্নিমান অন্তর্গৃহে ব্যর্থ মেঘের দ্রবণ ঢালি। মোহনাবিহীন দ্রবণ-অগ্নি বিভাজিত সঞ্চারপথে যেন প্রস্তরময়, গ্যাসীয় গ্রহ। তবে অলাতচক্র দূরস্থ কোয়েজার আর উপস্থ ধূলিপুঞ্জে ফোটায় সমরূপী টংকারধ্বনি। ছায়াশরীর বিমূঢ় চেতনাকে কখনো করে না বিনির্মুক্ত।

 

অধিগ্রহণকাল

নির্বাক ঝরনাজলে কেঁপে ওঠে আহত স্থলপদ্ম। আমি তার সুনীল শেকড়ের দিকে চেয়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ি। শহরের নিষ্প্রদীপ ধূসরতায় ধান জন্মে না বলে উজ্জ্বল অরণ্যের গন্ধে ডুবে থাকি। বিশুদ্ধ বাতাসে ভাসে হর্নবিলের দুর্বোধ্য ভাষা। সন্ধ্যার স্থিরতায় মিশে থাকে অধিগ্রহণকাল; আমি প্রাগৈতিহাসিক গুহা-দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখি সময়ের সুরঞ্জিত ঝালর। প্রথম জেগে ওঠে পাহাড় — রাতের পাখির চোখে মূর্ত হয় ভূকম্প-বিভীষিকা। কোমল স্থলপদ্ম অস্তায়মান সূর্যের ফিকে আলোয় নিমগ্ন হতে চায়। প্রস্রবণ রেখার রহস্যগতি উন্মোচিত না হলে অন্তঃপুরে সঞ্চিত হয় শ্রাবণমেঘের ধূপছায়া ফটোগ্রাফ!

 

বৃক্ষবিভাস ও প্রলয়স্বপ্ন

নিদ্রায় বিকৃত হয় বৃক্ষের কাণ্ড-পত্র-বল্কল। বন্যার অস্থির জলে সাময়িক নিমজ্জনে বিক্ষত হয় বৃক্ষবিভাস। বৃক্ষ জেগে ওঠে — ঘাসে ঢাকা থাকে তার কর্দমাক্ত তলদেশ। দুর্বহ গন্ধ নিয়ে কর্দম নরম থাকে না অনন্তকাল। অগ্নিময় নক্ষত্র বিপন্ন বৃক্ষের বাগভঙ্গি বোঝে। কাদা-গন্ধ বৃক্ষের বোধিময় সত্তায় পাংশু মেঘের পাহাড় গড়ে তোলে। অধিকৃত সূর্য পাহাড় গলাতে পারে না। চন্দনঅরণ্য ঘোচাতে পারে না মেঘের পূতিগন্ধ। পরিযায়ী পাখির সংগীতময় প্রার্থনা বাতাসে নির্মাণ করে ¯বিমগ্ধতার সাঁকো; বৃক্ষের সাথে তার যোগসূত্র ছিন্ন হয় বারংবার। নিঃসঙ্গ বৃক্ষের শেকড়ে নেই পুনর্ভবী শিহরন। বৃক্ষের রক্তে নিদ্রার বিষ; বিষে প্রলয়স্বপ্ন — বৃক্ষের শয়ন বেদনাবহ; মৃত্তিকাস্পর্শী কাণ্ড-পল্লব শানাই বাজাতে পারে না। তাপিত ধুলো নিঃশেষ করে শেকড়-সুরক্ষিত জলকর। আকাশ বৈরী হয়ে ওঠে; রোদ কিংবা বৃষ্টি আনে না বয়ে সন্তলিখিত সুসমাচার। বৃক্ষের ক্রন্দনবাহী মাধ্যম দূষণগ্রস্ত বলে বিষণ্ন স্বরগ্রাম আঁকতে পারে না শূন্যতার অবিনাশী অন্ধকার।

 

তীরধস তাড়িত জল, নির্মলতা

তীরধস তাড়িত জল পরিশ্রুত নয় জেনেও জলকে বলো নির্মল হও। নির্মলতার সর্বাদৃত মানদণ্ড নেই। বিশুদ্ধতা মেনে নেয় সূক্ষ্ম শিলাচূর্ণের প্রেম। শুকনো পাতার তুমুল উড্ডয়ন তোমাকে চিন্তাগ্রস্ত করে। যা সহজে ওড়ে না তারও ঘটে যেতে পারে পক্ষোদ্গম। গণিত চূড়ান্ত বিষয় নয়। চূড়ান্ত বিষয়ের অভিজ্ঞা কোন কালসারণি যোগে অধিগম্য নয়। নদীখাতের ক্রমিক বিবর্তনের সূত্র ধরে উদ্ভাসিত হয় চূড়ান্ত বিষয়ের প্রকরণজ্ঞান। ভবিষ্যৎ কমলারং ভোরের মতো স্পষ্ট নয়। শ্যামলা চাদরে ঢাকা থাকতে পারে কার্পাস কিংবা পড়েনের পরিত্যক্ত সুতো। বায়ুচঞ্চল মসলিনে ঢেকে রাখো বাসমতী সৌরভ; বাতাসের নেই কোন কলঙ্ককালিমা।

 

অলক্ষ্য লিথস্ফিয়ার

(পরম শ্রদ্ধাস্পদ ড. বিনয় কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিবেদিত)

অন্ধকারের অলক্ষ্য লিথস্ফিয়ারে পদযাত্রার প্রস্তুতি চলে। সূর্যের কোরিওগ্রাফি বৃক্ষের নিষ্ক্রিয়তা মোচন করে না, ক্লরফিলশূন্য সেই দুর্গমনীয় ভূমণ্ডলে নিঃসঙ্গ যাত্রার ক্লান্তি নিবারণের জন্য গুছিয়ে রাখি মেঘের শীতল ব্যাগ। উদ্ভাসউতল শব্দাবলি উদ্ধারপ্রার্থী — যাত্রার আগে তাদের শুভ্র শেল্ফে তুলে রাখা চাই। শালবাগান পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে একদা কিছু বৃষ্টিসিক্ত স্ফটিক লুকিয়ে রেখেছিলাম, সেগুলো চোখের জলে ধুয়ে রাখা দরকার। আমি গহন বোধিগৃহে কাটাবো কিছু কাল; অশ্রুকাতর চন্দ্রঘন্টার পদপৃষ্ঠে মাথা রেখে দর্শন করেছিলাম জীবনময়ূর। আমি একদিন সমুজ্জ্বল শাঁওডাঙি বনস্থলীর প্রাণপ্রৈতিরহস্য জেনে নিতে চাই আমার নিরহংকার আচার্যের কাছে; তাঁর মধুভাষণে জেগে ওঠে মাধবধারা — নিয়ত ধুয়ে দেয় তাঁর পারিজাতবর্ণ পথের ধুলো। আমার মুহূর্তগুলো হয়ে উঠছে ক্রিয়াসক্ত; গহিন স্রোতের বর্ণিল আভায় ডুবিয়ে রাখি অশান্ত ধূসর আঙুল।

 

মৃত্যুগানের শূন্যতা হতে

পত্রালিক্রন্দন মৃত্যুগানের শূন্যতা হতে ঝরে পড়ে তামাটে পাথরের উত্থানশূন্য বক্ষঃস্থলে। পাথরের ম্লান হাসি জন্মগন্ধ ছুঁয়ে আসে। অস্পষ্ট মাতৃমুখ স্বপ্নের জ্বালামুখ বেয়ে গড়ে তোলে গভীরসমুদ্র তলদেশ। বালিয়াড়ি অন্তরালে রাখে অথই সংলাপের সোনালি কংকাল। জ্যোতির্বলয়তাপে পাথর দৃষ্টি খোলে। বিপন্ন আলোয় জেগে ওঠে কালপেঁচা অন্ধকার। লালাক্লিন্ন রুমাল ঢেকে রাখে জ্যোৎস্নাময় বাতাসের ঝাঁজর। জন্মপূর্ব অস্তিত্বের আহ্বানে কেঁপে ওঠে পাথরঃ হে অগ্নিনির্ভর পত্রালি, আদি ভস্মমেঘে ভাসাও অনন্তকাল।

 

 খোয়ইজলে ভেসে যাওয়া

দরজা খুলে  দাঁড়াতেই বাতাসে একটানা বাজতে থাকে পার্থিব ঝুমঝুমি। আমি পার্থিব শব্দের সৈকতে হেঁটে হেঁটে পর্বতে প্রতিধ্বনিত অর্ফিয়াসের গান শুনি। অথচ ঝুমঝুমির শব্দ দুঃসহ কেনো? যারা ঝুমঝুমি বাজায় তারা কি বৃন্দবাদনের দেয়নি মহড়া? দরজা বন্ধ করে সিডরতাড়িত হরিণের মতো পড়ে থাকি, নিশ্চুপ, আপাত চেতানহীন। দেয়ালঘড়িতে প্রতিশব্দিত হৃৎপিণ্ড অস্পৃশ্য তারাবাতির মতো জ্বলে ওঠে। সিলিংকেন্দ্রে চুনকামের আলোছায়া নির্মাণ করে রবীন্দ্রস্কেচ। আমি কাজুও আজুমার মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকি, নির্নিমেষ। রবীন্দ্রনাথের বেদনার গানে আমার ঘর ও পৃথিবী খোয়াইজলে পদ্ম-পাপড়ির মতো ভেসে যেতে থাকে।

 

ব্লেড ও নির্মোক

চন্দ্রবর্ণ ব্লেড প্রতিমুহূর্তে কাটে পাঁজর-প্রচ্ছাদিত আরক্ত কোষ।

রক্তশূন্য শরীর হাহাকার করে ওঠে। সূর্যহীন প্রান্তরে

অস্পষ্ট পত্রালি হতে ঝরে পড়ে বিষণ্ন মন্দ্রসপ্তক;

আমার করপুটে বিষাদিত পেয়ালা পূর্ণ হয়ে ওঠে।

রাত্রিপ্রমগ্ন পাখির রেশমি পিঠে মাতরিশ্বা ধারণ করে

সংবেদ্য স্বরূপ; অবিন্যস্ত ধূসর চুলে তুলে নিই

বাতাসের প্রান্তিক শুশ্রুষা। অন্ধকার মধ্যাকাশে

ভাসে ইথারীয় মন — বিরামপুরের নিভৃত অতীত

টুকরো করে শূন্যে ছুঁড়ে চলি অনাশ্য ডিসক্যাস।

নিবিড় ঘাসের ফাঁকে নাগপত্নী রেখে যায় প্রতপ্ত নির্মোক।

 

পাথর- পিপাসা

মুহূর্তে মিরপুর ফিরে যাই।

ক্রন্দনার্ত দুটো চোখ ডাক দেয় পল্লবী ভাষায়।

অনিয়ত কম্পন আমাকে ঘর্মাক্ত করে তোলে।

অদৃশ্য হাওয়া-মোরগ প্রচার করে লাপিস লাজুলি অনিবার্যতা।

দারুময় সূক্ষ্মদর্শিতার চেয়ে পদ্মস্পর্শী সংবেদনা তেজোদীপ্ত হয়ে ওঠে।

মাঝেমধ্যে বনবহ্নির প্রাকৃত পার্বণে বিশুষ্ক আজ্ঞাপত্র

বিসর্জিত না হলে জীবনের নবীভবন হয় না বিনিশ্চিত।

আমি অন্ধকারের অন্তর্দ্বার খুলে বিপন্ন জলে

নিমজ্জিত হতে থাকি। জলের তলদেশ হতে

নক্ষত্রের মতো জ্বলে ওঠে এক শুভ্র পাথর;

আমার নির্বাণোন্মুখ ওষ্ঠাধর ও বক্ষে

অকল্প্য, দাহ্য পঙ্ক্তি লিখে

আমাকে রেখে যায় প্রথা-পঙ্গু মরুদ্বীপে।

আমাকে বাঁচিয়ে রাখে পবিত্র পাথর-পিপাসা।

 

নিরঞ্জন মানবের সৌর হৃদয়

ধূসরকৃষ্ণ বেলে পাথরের বিগ্রহের পাশে

মাঝেমধ্যে ফণা তোলে

শঙ্খশুভ্র এক বাস্তুসাপ।

 

কোটিলামুড়া স্তূপ-গহ্বর হতে উত্তোলিত

ধ্যানাবিষ্ট প্রাস্তরিক বুদ্ধের মতো

আমি যখন নিরঞ্জন মানবের

সৌর হৃদয় নিরীক্ষণে মগ্ন

আমার ভেতরে তখন জেগে ওঠে

ফণার শ্বেতাভ প্রতিচ্ছায়া।

 

আমার সুভোজ্য মাংসের ভেতর শাশ্বতিক ¯স্নায়ু;

স্নায়ুর ভেতর পুণ্ড্রপ্রাণ করতোয়ার বিপ্রতীপ ¯স্রোতধারা।

দিনের আবিল জল রাতের শুদ্ধকল্যাণে পরিস্রুত হলে

স্রোতধারাতে ভেসে চলে সহস্র সুবাসিত শ্বেতকমল ;

সমস্ত ফুলদলে বিম্বিত হয় শঙ্খফণা।

 

ছায়াশীতল জলে তখন স্নান করে যূথবদ্ধ মানুষ ও ঈশ্বর।

 

জলময়ূরের পালক

(মায়ামঞ্জরিকে)

জলময়ূরের পালক জাগিয়েছে বুকে অপার উত্তাপ।

হৃদয়-সূত্রে গেঁথে যাবো অরুণাভ কিংখাপ।

আমার সমস্ত সত্তায় মিশে থাকে তার নাম।

আসমানি রুমালে নিত্য মুছি হৃদয়-ঘাম।

হৃদয়ের ধূপছায়া খামে রেখেছি তার ছবি।

হীরের কান্তি কেড়ে তার, দীপ্র হয়েছে রবি।

নিমগ্ন হৃদয় উদয়াস্ত আঁকে ইতিহাস।

ধীমান এক সম্পাদক মুদ্রণে টানে নিতি রাস।

গহন পর্বত গাত্রে লিখে রাখি গূঢ় চিঠি

একদিন হবে আকুল সুদূরিকার দীপ্ত দিঠি।

আকাশমনির পাতায় পাতায় লিখে রাখি পত্র

আলতাপরীর চোখে পড়–ক বেদনার নীল ছত্র।

কনকচূড়ার মগডালে কাজরি গায় নীলপরী।

বিজন বুকে ঝড় তোলে দিনাজপুরের কিন্নরী।

আমার মগ্নতা ভাঙে কথা আর টেলিফোন।

অশক্ত হৃদয় খোঁজে শুধু দূর লোনা বন।

মধ্যরাতে সেল ফোন তুলে আনে সাগর মল্লার।

অবচেতনার গহন হ্রদে কাঁপে শ্বেত কহ্লার।

১০

বিজন রাতের বুকে ঝরে তার কথার বকুল।

উদাসী বাতাসের শিরায় জমে গন্ধ অতুল।

১১

নির্জন রাতের ইথারে ভাসে অচিন্ত্য প্রপাত।

হৃদয়ের বিহ্বল তারে ছড় ঘষে সুনীল মৌতাত।

১২

কফিন-আঁধারে আবৃত হয় না যা কোনো দিন।

তার হৃদয়-মন্দাকিনী খুঁজে নিক সেই মহামীন।

১৩

আমার বোধির মধ্যে প্রজ্বলিত প্রিয়ার বোধন।

পাতার মতো তত্ত্ব ঝরে, ঝরে যায় না রোদন।

১৪

কোথাও আমার লেগেছে আগুন কিছু যায় পুড়ে।

গহন-গামী জল খুঁজি সজল ধরণি জুড়ে।

১৫

যে আগুন গলায় ও ছাঁচে ঢেলে ফেরায় শরীর,

একবার তার দেখা পেলে কি দরকার গুণিন, জড়ির?

১৬

এক পেলব পাত্রে মুখ রেখে হয়ে উঠি অমর।

হৃদয়ে রক্তচন্দন ঘষে দুঃসহ সমর।

১৭

হৃদয়-গ্রন্থের পাতায় দেখি পুষ্প-কোমল জীবন।

সবটুকু তার করে ধারণ শাস্ত্র কিংবা সীবন?

১৮

বিজন শৈলাগারে লেগে রয় ব্যাকুল বরষা।

এক গোছা পিঙ্গল অর্কিড বাউলের অন্তিম ভরসা।

১৯

জারুল উচ্ছ্বাসে রংপুরে কাটে গ্রীষ্ম প্রহর।

একটি বেগুনি জর্জেট শুষে নেয় তীব্র জহর।

২০

বাদল বরিষণ ডাহুকের চোখে আঁকে স্বপন।

অবোধ কিষাণ স্বক্ষেতে করে বেদনা বপন।

২১

শস্য-উজল মাঠে দাঁড়িয়ে আমি নিই নিশ্বাস।

অন্তরে তার, অন্নজল খোঁজে গোলাপি বিশ্বাস।

২২

শূন্য পথের ধারে দেখেছি বুঝি মান্দার ফুল।

চেতনার নির্ঝরে ভেসে যায় অতুল দীঘল চুল।

২৩

দুর্বহ কান্নায় অদূরে নেমে আসে আকাশ।

সজল হিজলের শাখায় জাগে সন্তাপী আভাস

২৪

পরিযায়ী পাখির চোখে যখন দেখি তাকে,

শালুক-বাতাস রক্তে আমার হংস মিথুন আঁকে।

২৫

রেশমি কদম ছোঁবে না জানি রক্ত-ভেজা বুক!

হিমেল রাতের পবনে খুঁজে ফিরি মৃত্যু-সুখ।

২৬

শেষ বাতাসের সাথে ফুরায় কি জীবনের লেনদেন?

ক্রন্দন-তরঙ্গ জাগায় অহর্নিশ সাগর সফেন।

২৭

পাথর চোখে একদিন বয়ে যাবে তীব্র সাইমুম।

কুম্ভশালে পড়ে রবে এক তিল হৃদয় কুঙ্কুম।

২৮

চাঁদের গুহায় পড়ে থাকে পায়রার ছিন্ন পালক,

নেবুলার বক্ষ চিরে ছুটে যায় মগ্ন চালক।

২৯

সৌরলোকের শ্বেত পর্দায় দেখি শূন্যতার খেলা।

বর্ণিল আলোর মাঝে ধেয়ে চলে হৃদয়-ভেলা।

৩০

বিষণ্ন ঘুঘুর চোখে উৎকীর্ণ হৃদয়ের ধস্কা কাছাড় ;

ভাঙনের ধস্ ধস্ শব্দে নিয়ত খাচ্ছি আছাড়।

৩১

দুর্ভর অশ্রু-তরঙ্গ খুঁজে পাবে না তার মুখ।

উদ্বেল হৃৎ-যমুনায় কোন কালিয়ার মিলেছে সুখ?

৩২

আমার নিস্তরঙ্গ ঘরে দিগন্তের অবভাস।

ধূসরিত সবুজ বনে বসন্তের উপহাস।

৩৩

উল্লোল অস্তিত্ব নিংড়ানো দুফোঁটা উষ্ণ জল,

কবে ছোঁবে তার জ্যোৎস্না-প্রসাধিত বক্ষতল?

৩৪

আমার চির-ক্রন্দিত গভীরের লাজুক বোতাম,

কোষজ বোতলে তার, নীরবে খুলে রাখলাম।

৩৫

আমার পৃথিবী কাঁপে, আমি কাঁপি থরথর।

সুরমার দীপিত হৃদয়, ফোটায় পাতায় মর্মর।

৩৬

যে আমার নিশ্বাস — সত্য ও আপাতঅদৃশ্য,

যে মুহূর্তে মৃত আমি, তার কাছে অস্পৃশ্য।

৩৭

নিস্তব্ধ হয়ে থাকি মাটির কবর।

বাতাসেই ভেসে থাক অনন্ত খবর।

৩৮

প্রেমের পরমায়ু যদি বাড়ায় হারাকিরি,

তীক্ষ্ম খড়্গে তবে জরা-প্রবণ জঠর চিরি।

৩৯

আমার ঠোঁটের গন্ধে ভরে উঠবে মাছিদের নাক।

ডোমের দাপটে বিরক্ত হবে ক্ষুধাতুর কাক।

৪০

আমার সৎকারে যদি তীব্র হয় জমিন, অগ্নির দ্রোহ;

বিমল সৌরলোক হতে নেমে আসবে এক বিহ্বল গ্রহ ।

 

ফিরে যাও

ফিরে যাও সমুদ্র, ফিরে যাও তরঙ্গ

রক্তিম মীনের নিস্তরঙ্গ ঠোঁট যদি ছোঁয় বিবাগী করঙ্গ

কী ক্ষতি সমুদ্রের, সমুদ্র অভিযাত্রীর?

 

ফিরে যাও নদী, ফিরে যাও স্রোতধারা

অবসন্ন পুণ্যার্থী যদি হয় ব্রতহারা

কী ক্ষতি নদীর, নদী-প্রদাত্রীর?

 

ফিরে যাও জল, ফিরে যাও পিপাসা

ক্লান্ত মরু-পান্থ যদি খুঁজে না পায় বিপাশা

কী ক্ষতি জলের, জল-ধাত্রীর?

 

ফিরে যাও গ্রহ, ফিরে যাও আবর্তন

নির্গ্রহ নীলকণ্ঠের বুকে জাগে যদি প্রলয়ের পরাবর্তন

কী ক্ষতি গ্রহের, গ্রহ-যাত্রীর?

 

ফিরে যাও সূর্য, ফিরে যাও আলোক

কৃষ্ণ পেচক যদি খুঁটে খায় চোখের ঝলক

কী ক্ষতি সূর্যের, সূর্য-ধারকের?

 

ফিরে যাও অগ্নি, ফিরে যাও উত্তাপ

যাচে যদি কেউ নিরুত্তাপ জীবনের অভিশাপ

কী ক্ষতি অগ্নির, অগ্নি-বাহকের?

 

ফিরে যাও মাটি, ফিরে যাও ধানচারা

কৃষকের উদ্যানে যদি ফলে শুধু বিষাক্ত সান্তারা

কী ক্ষতি মাটির, মাটি শাসকের?

 

ফিরে যাও আকাশ, ফিরে যাও নীলিমা

হরিয়াল-সরালের পাখা হতে মুছে যায় যদি সকল শ্যামলিমা

কী ক্ষতি আকাশের, আকাশ দ্রষ্টার?

 

ফিরে যাও বাতাস, ফিরে যাও প্রশ্বাস

নিষ্ফল বৃক্ষ যদি ছুঁড়ে ফেলে নিশ্বাস

কী ক্ষতি বাতাসের, বাতাস স্রষ্টার?

 

সোনা ইরির গান

রোদ-চকচকে টুকরো পলিথিন ও ধুলো উড়িয়ে

আমরা ছয় পুরুষের ভিটের দিকে ফিরছি।

তিস্তা ব্রিজের নিচে পড়ে আছে প্রাগৈতিহাসিক

নদীর কঙ্কাল। সভ্যতা রাজপথে কপট ঘোড়া

ছুটিয়ে আচার্য সহিসদের ক্রমান্বয়ে করেছে নপুংসক।

এখন ক্রন্দনে বা মন্ত্র উচ্চারণে জীবন-দেবতার

টনক নড়ে না। নদীর জলতরঙ্গ জীবন ফিরে

আসবে না বলে পাম্পে সোনালি

তেল ঝরিয়ে বা দরবারি বিদ্যুতের শিহরন

ঢুকিয়ে মাটির জরায়ু থেকে কৃষি-কুশল

মানুষ টেনে আনে জলের বিপন্ন ভ্রূণ।

বৈশাখী সবুজ জর্জেট ঢেকে রাখে গলিত শরীর;

হরমুজের ফ্যাকাসে চোখে ভাসে সোনা ইরির গান।

 

নোরার প্রত্যাবর্তন

টরভাল্ডের হাট করা কবাটে লাথির অমোচ্য অলংকরণ।

স্রোতে ভাসিয়ে শকুনের ঠোকর, ক্ষত শব্দাবলি,

সদ্যস্নাতা নোরা ফিরে এসেছে জ্যোতির্ময় ঘরে।

হিরণ্ময় চাবির সাথে হাতে নিয়েছে তুলে তীক্ষ্ণধার চাকু,

কণ্ঠে ভয় কি মরণে বজ্রসংগীত,

করোটিতে অসমাপ্ত যুদ্ধের দাউদাউ স্কেচ।

শুক্লার অ্যাসিড-ঝলসিত হৃৎপিণ্ডের পরমার্ত চিৎকার

নোরার ট্যারান্টেলায় জাগিয়ে তুলেছে এক রুদ্র ঝংকার;

শত খোকন, চঞ্চলের নিশ্বাস কালিখোলার অবারিত মাঠে

চাকুর চুম্বকে নতজানু।

পাথর, চাঙড়ের প্রাচীন গ্রয়িন ভেঙে

নেমে আসছে অলকনন্দার প্লাবন, হাঙরের হাঁ —

নূরজাহান, ফিরোজার বেকুব দণ্ডদাতারা

সরীসৃপের গলনালীতে তুলছে সকরুণ ভেক-ক্রন্দন।

 

দুর্জয় আত্মার সপক্ষে নির্বাক স্বদেশ

সাতাশি হাজার শ্বেত কপোতের ঠোঁটে

ঝুলিয়ে রাখে সুপ্রভ মাভৈঃ ফেস্টুন।

 

ঋত্বিক ঘোটক

যন্ত্রণা-যাপিত শতাব্দী ষাটেকের বিদগ্ধ খুরক্ষেপে

পথে পথে পাণ্ডুগ্রহ পথিকের নেপথ্যে

ছুটে চলেছে এক ঋত্বিক ঘোটক।

 

খুরপ্রান্তে খেউড় ভাঁজে কপিশ কংকর,

তিস্তাঞ্চলে ঘোটকের গতি হলো মন্থর।

 

বাড়ন্ত তামাকের খেতে

তামাটে মানুষের ন্যুব্জ পিঠে ফোস্কার স্ফুটন

দুর্বিষহ হ্র্রেষার প্রতিধ্বনি তোলে বায়ুস্তরেঃ

হায় তামাটে মানুষ, নাড়ির কোটি শিখা হলো না ম্লান

মজদুরি অঙ্গারদ্বিঅম্লজে।

 

ক্ষিপ্র খুরে ঘোটক ছুটে এলো নীলক্ষেত,

আন্তর সংবেদে জেগেছে ধূসর সংকেত।

 

মানুষের হাতের মতোই কিছু বিপন্ন মিছিল

বিষণ্ন নৈপুণ্যে বস্তায় ঝেড়ে পুরছে আঁস্তাকুড়ের কাগজ।

কাছে গোছাবার রয়েছে অবশিষ্ট কিছু বেসাতি জীবন —

টুকরো টিন, ভাঙা কাচ, পরিত্যক্ত খেলনা-বাসন-ব্রাশ।

 

অকস্মাৎ শ্রুতিপথে এলো এক নিবদ্ধ ঝংকৃতি,

কালপঞ্জি খুরে মগ্ন হয় মুগ্ধ অনুসৃতিঃ

নটিনীর চরণে নূপুর বাজে

নাকে তেটে তিন্তা

পেয়ালায় কালের বিলাসী টুংটাং।

জাগে আসঙ্গ অস্থিরতা।

ঘোটকের হাঁচিতে ভয়ঙ্কর শ্লেষ্মা ঝরে।

ঝিঙুর অন্ধকারে অতঃপর,

জীবন্ত কঙ্কালের আস্তানায় উঁকি মারে সে পুনর্বারঃ

নির্জীব ঠোঁটে ভালোবাসা ফোটে। ফোটে কি?

আজো নুন-ভাতে ভরেনি ফুটো শানকি।

ট্যাং কবিতা – গৌরাঙ্গ মোহান্ত

ট্যাং কবিতা – গৌরাঙ্গ মোহান্ত

ঝ্যাং রো-জু  [৬৬৬-৭২০] বসন্ত, নদী, পুষ্পগুচ্ছ, চাঁদ: রাত   বসন্তে নদী সমুদ্রতল অব্দি স্ফীত হয়, জোয়ার-ভাঁটায় চাপতে ওঠে উজ্জ্বল চাঁদ। অসীম আলো নিয়ে জল চমকায়। বসন্ত নদীর ওপর কি থাকে না উজ্জ্বল চাঁদ? পুষ্প সুরভিত মাঠের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে নদী, জ্যোৎস্নায় চিকচিক করে ওঠে…